১০:০২ পি.এম
বরগুনার তালতলীতে টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নিলামের নামে ঝড়ে পড়া গাছের আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলামের যোগসাজশের মাধ্যমে এসব গাছ কাটা হয়েছে। তাঁদের দাবি, নিলামের শর্ত ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাব খাটিয়ে গাছগুলো কাটা হয়েছে। গাছ কাটার আলামত মুছতে গাছের গোড়ায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের অধীন আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লট নম্বর ০৫ ও ০৬-এর বিপরীতে বনজ সম্পদ উত্তোলনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১ জুলাই উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
দরপত্র বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, লট দুটির মূল্য ৫৯ হাজার ৪৭০ টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট ৮ হাজার ৯২১ টাকা এবং ১০ শতাংশ আয়কর ৫ হাজার ৯৪৭ টাকাসহ মোট ৭৪ হাজার ৩৮৮ টাকা রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়ে লট দুটি ক্রয় করেন মো. সোহেল রানা।
আরও পড়ুন: সাভার পৌর ছাত্রদলের সভাপতি আরমান হোসেন বাবু বহিষ্কার
নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের চর রতনের পূর্ব পাশে বাগান এলাকায় অবস্থিত ৫ নম্বর লটে মার্ক করা ১ থেকে ২৫ ক্রমিক নম্বরের ২৫টি গাছ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব গাছের মোট কাঠের পরিমাণ ৭৮ দশমিক ৩৫ ঘনফুট এবং জ্বালানি ৪৮ ঘনফুট। একই এলাকার ৬ নম্বর লটে ২৬ থেকে ৫০ ক্রমিক নম্বরের আরও ২৫টি গাছ রয়েছে। এতে কাঠের পরিমাণ ৭০ দশমিক ১৯ ঘনফুট এবং জ্বালানি ৪২ ঘনফুট।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কার্যাদেশ অনুযায়ী গত ১ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত গাছ কাটার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গাছ কাটা শেষ না করে গত ১০ অক্টোবর নিলামকৃত গাছ কেটে নেওয়া হয়। পরে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্র উত্তাল থাকার কারণ দেখিয়ে ১২ অক্টোবর সময় বাড়ানোর আবেদন করেন ক্রেতা সোহেল রানা। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ অক্টোবর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়া স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।
গত ৬ নভেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের চর রওশনের পূর্ব পাশের বাগান এলাকায় নিলামে বিক্রি করা ঝড়ে পড়া গাছের পাশাপাশি জীবিত গাছও কাটা হচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই ট্রলারে করে গাছ নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিলামের আওতাভুক্ত ঝড়ে পড়া গাছের আড়ালে অর্ধশতাধিক জীবিত গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে।
এ সময় নিলামকৃত গাছে বন বিভাগের নির্ধারিত মার্ক থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ গাছে কোনো মার্ক বা সিল দেখা যায়নি। এমনকি বিভিন্ন গাছে একই ক্রমিক নম্বর ব্যবহার করে চিহ্নিত করার অনিয়মও চোখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে আকাশমনি, ঝাউ ও বাবলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবিত গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ৭ নভেম্বরের চেতনায় দেশকে সমৃদ্ধ করতে হবে: সিসিক প্রশাসক
এ ছাড়া গাছ কাটার আলামত নষ্ট করতে কয়েকটি গাছের গোড়ায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও দেখা যায়। খবর পেয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গেলেও একাধিক জীবিত গাছ কাটা অবস্থায় দেখতে পান। তবে তিনি মাত্র একটি গাছের চারটি খণ্ড জব্দ করেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম নিলাম ক্রয়কারী ব্যক্তির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বনের জীবিত গাছ কাটার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসেও তিনি রহস্যজনক কারণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি।
অভিযোগ অস্বীকার করে নিলামে গাছ ক্রয়কারী সোহেল রানা বলেন, ‘নিলামের মাধ্যমে আমরা শুধু ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছগুলোই কেটেছি। এর বাইরে কোনো জীবিত গাছ কাটা হয়নি। আগুন লাগানোর ঘটনার সঙ্গেও আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কে বা কারা আগুন দিয়েছে, সে বিষয়েও আমাদের জানা নেই।’
নলবুনিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত বিট কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, ‘আগের বিট কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন আগে আমি দায়িত্ব নিয়েছি। একই ক্রমিক নম্বর একাধিক গাছে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, যিনি গাছগুলো মার্ক করেছেন, এটি তাঁর ভুল ছিল।’ তবে বর্তমানে ঠিক কতটি গাছ কাটা হয়েছে এবং কতটি গাছ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
আরও পড়ুন: মোংলার পশুর নদীতে নিখোঁজ বাল্কহেড-কার্গোর নিরাপত্তাকর্মী সাবিত খান
অভিযোগ অস্বীকার করে বন বিভাগের আমতলী রেঞ্জ (তালতলী) কেন্দ্রের রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের আগেই গাছের নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তাই এ ঘটনায় আমার কোনো সুবিধা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’
তবে জীবিত গাছ কাটার ঘটনা ও বনে আগুন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আকাশ মনি গাছের চারটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে বন বিভাগের বরগুনা কার্যালয়ের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন ভূঞা বলেন, ‘নলবুনিয়া ক্যাম্পে অনুমোদিত দুটি লটের আওতায় মোট ৫০টি গাছ আহরণের কার্যক্রম চলমান ছিল। এর বাইরে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত একটি আকাশমনি গাছ অবৈধভাবে কাটার বিষয়টি ধরা পড়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের লুটপাটে গরীব উল্লাহ শাহ মাজারও আক্রান্ত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন