১২:৫৪ পি.এম
ঢাকা, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ : আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে রাস্তার পাশে কাজের জন্য অপেক্ষা করছেন শ্রমিকেরা। তাদের মধ্যে গুলাম সাখি বারাতও রয়েছেন। প্রতিদিনের মতো তিনিও সেখানে এসেছেন কাজের সন্ধানে। তবে ইরান ও পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ আফগান দেশে ফিরে আসার ফলে কাজ ও বাসস্থানের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
গত তিন বছরের কিছু বেশি সময়ে ইরান ও পাকিস্তান থেকে ৬০ লাখেরও বেশি আফগান দেশে ফিরে এসেছেন। কয়েক দশক ধরে সংঘাতের কারণে এসব দেশে আশ্রয় নেওয়া আফগানদের ফিরিয়ে দিতে সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বহিষ্কার অভিযান শুরু করেছে প্রতিবেশী দেশ দুটি।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
আফগানিস্তানের জওজজান প্রদেশের রাজধানী শেবেরঘানে সাতজন স্বজনের ভরণপোষণের দায়িত্ব ৮৩ বছর বয়সী বারাতের কাঁধে রয়েছে। তার মতে, দেশে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ না খেয়ে থাকছে। দেশে ফিরে আসা মানুষদের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। যারা নতুন করে ফিরেছে, তাদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যারা আগে থেকেই এখানে বসবাস করছে, তারা কোনো সহায়তা পাচ্ছে না।’
ইরান ও পাকিস্তান সীমান্ত থেকে জওজজান প্রদেশের দূরত্ব কয়েকশ কিলোমিটার হলেও অনেক আফগান সেখানে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে কেউ একসময় ওই এলাকায় বসবাস করতেন, আবার কারও পরিবারের সদস্যরা বহু বছর আগে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন।
৬০ বছর বয়সী আবদুল কাদের হোটাক দুই দশক পাকিস্তানে কাটিয়ে জওজজানে ফিরেছেন। কিন্তু সেখানে তার পরিবারের কোনো জমি বা নিজস্ব বাড়ি নেই।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
আট মাস আগে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে দেশে ফেরার পর তার সন্তানদের জীবনও বদলে গেছে।
হোটাক বলেন, ‘পাকিস্তানে আমার সন্তানরা স্কুলে যেত, পড়াশোনা করত। এখন তাদের সবাইকে কিছু আয় করার জন্য আবর্জনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’
পানি ও বাসস্থানের সংকট আরও তীব্র
প্রদেশটির আকচা এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের ফিরে আসার কারণে জনসংখ্যা ২৬ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ। খরাপীড়িত এই জেলায় পানির সংকটও গুরুতর হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: ডিজেল রপ্তানি বাড়াতে চায় ভারত, শোধনাগারগুলো সক্ষমতা বাড়াচ্ছে
৫৪ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি ফকির মোহাম্মদ খুদাবখশ গত দুই দশক ধরে কাজের সন্ধানে ইরানে যাওয়া-আসা করেছেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পান।
শেবেরঘানে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কাজের অপেক্ষায় থাকা খুদাবখশ বলেন, ‘যারা আফগানিস্তানে ফিরে এসেছে, তাদের প্রত্যেকেরই থাকার জন্য একটি জায়গা ও কাজ দরকার। কিন্তু তাদের কোনোটিই নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাবার ও পোশাক কেনার পেছনে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে আমাদের বাড়িভাড়া দিতে হচ্ছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমরা অপুষ্টিতে ভুগছি।’
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রতি তিনজনের প্রায় একজন, অর্থাৎ ১ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটের গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি সংকটজনক বা তার চেয়েও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আরও পড়ুন: ভারত মহাসাগরে ১৩ দিনের যৌথ মিশনে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া
বাসস্থান নিয়েও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এএফপির সঙ্গে কথা বলা স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো কোনো এলাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
‘আল্লাহ নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করবেন’
জওজজান প্রদেশের তথ্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন মুত্তাসেমের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা দেশে ফিরে আসা মানুষদের নিয়ে সমাধানহীন কোনো সমস্যা নেই।
আফগানিস্তানে বেকার মানুষ নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কাজ না করে, তাহলে বুঝতে হবে সে নিজের আরাম-আয়েশের প্রতি বেশি আসক্ত এবং তিনি কাজ করতে চায় না।’
আরও পড়ুন: ভারতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালাতে চায় জাপান
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকার দেশব্যাপী একটি কমিটি গঠন করেছে বলেও জানান তিনি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩০ বছর বয়সী এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে বলেছেন, এমন কোনো কমিটির কথা তিনি কখনো শোনেননি। গত ১৮ মাসে তার বাড়িভাড়া দ্বিগুণ হয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে শুধু আহমাদি নামে পরিচয় দেওয়া ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ার পর অর্থনৈতিক সমস্যা আরও বেড়েছে।’
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছিল, দেশে ফিরে আসা মানুষ ও তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠী— উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন: সংস্কৃতিও যখন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার: শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক তত্ত্বের প্রভাব
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের উপপ্রধান জর্জেট গ্যানন বলেন, ‘সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াতে পারে, আরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে এবং অস্থিতিশীলতা উসকে দিতে পারে।’
খরা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে
জওজজান প্রদেশে দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চারদিকে ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন পরিবেশ, মাটির তৈরি গম্বুজাকৃতির ঘরবাড়ি আর চরে বেড়ানো উট— এমন শুষ্ক পরিবেশের মধ্যেই চলছে মানুষের টিকে থাকার লড়াই।
প্রদেশটির তথ্য অধিদপ্তরের পরিচালক জানান, সেখানকার অধিকাংশ পানি এখন পান করা কিংবা কৃষিকাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বদলাতে একটি খাল নির্মাণ প্রকল্পের ওপর আশা রাখছেন তারা। তবে প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে আরও দুই বছর লাগতে পারে।
মুত্তাসেম বলেন, ‘আফগানিস্তানের মানুষ ক্ষুধা কিংবা তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছে না— তবে তাদের আশ্রয়ের ভীষণ প্রয়োজন।’
তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে প্রদেশটিতে ফিরে আসা মানুষের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘বাকি বিষয়গুলোর ব্যবস্থা আল্লাহ নিশ্চয়ই করবেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন