০৮:৫২ পি.এম
ঝালকাঠি জেলা শহরের পূর্ব কৃষ্ণকাঠি এলাকায় অবস্থিত তৈয়বিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ও পল্লী বিদ্যুৎ মসজিদকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসার অডিটর মো. আবু মুসা ও সহকারী শিক্ষক কারী ইব্রাহিম ও ক্বারী নুরুল্লাহর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কারী নুরুল্লাহর বিরুদ্ধে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনা ও অভিযোগ নিয়ে এলাকায় আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়গুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কারী নুরুল্লাহকে স্থানীয়রা আটক করেছিলেন। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন। পরে তিনি ঘটনাস্থল থেকে চলে যান এবং বর্তমানে এলাকায় নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ডাকাতিয়ায় সেতু না থাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ
তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিতে পল্লী বিদ্যুতের সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে।
তবে এ বিষয়ে জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইমামকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করায় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারি গাড়িতে করে তাকে বরিশালে পাঠানো হয়েছিল। সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ
তৈয়বিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মো. আবু মুসা ও সহকারী শিক্ষক কারী ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আলোচনা থাকলেও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়া আবু মুসার মাদ্রাসার অডিট-সংশ্লিষ্ট কাজে যাতায়াত এবং কামদেবপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় আরবি প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে। নলছিটি উপজেলার মানপাশা এলাকার একটি গার্লস স্কুলের এক ছাত্রীকে ঘিরে অতীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, আতঙ্কে এলাকাবাসী
তথ্য অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে মাদ্রাসায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্ব কৃষ্ণকাঠি তৈয়বিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে নারী-পুরুষসহ পাঁচজনের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
এ অভিযোগের সঙ্গে মাদ্রাসার সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা, প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব গোলাম মর্তুজা, মাওলানা মো. খলিলুর রহমান, অধ্যক্ষ মো. নজরুল তালুকদার ও সাবেক কমিশনার মজিবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নূরানী মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বই যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়নি। এমনকি সরকারি বই বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত বইয়ের সংখ্যা, বিতরণ, সংরক্ষণ ও হিসাব-নিকাশ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে বিজয়া দশমী: ব্রহ্মপুত্রের কাচারী ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি
মাদ্রাসা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের নামে বিদেশি সহায়তা সংগ্রহ এবং সেই অর্থের যথাযথ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন অনুদানের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে বিদেশি সহায়তার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদ্রাসা ও মসজিদকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না হওয়ায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক লেনদেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া, সরকারি বই বিতরণ, পরিচালনা কমিটির কার্যক্রম এবং শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে পূর্ব কৃষ্ণকাঠি তৈয়বিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব গোলাম মর্তুজার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান অডিটর আবু মুসাকে সরকারি গাড়িতে করে বরিশালে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং এর কারণ হিসেবে নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মাদ্রাসার শিক্ষক, অডিট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিচালনা কমিটি এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। বিশেষ করে শিশুদের যৌন নিপীড়ন এবং একজন প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো পক্ষের প্রভাব ছাড়াই তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা, দায়ী ব্যক্তি এবং ঘটনাগুলোর পেছনে কারও সহযোগিতা বা গাফিলতি ছিল কি না—তা পরিষ্কার হবে।
তবে এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর কোনোটিই আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন