০৮:০৫ এম
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত শাহ আলম নামের এক সহকারী শিক্ষকের বিষয়ে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর, প্রায় ৬ ঘণ্টার জন্য তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, পরে পুলিশ এসে তাঁকে হেফাজতে নেয়।
ইউনিয়ন পরিষদে বিষয়টি জানার পর, থানায় অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাঁকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। পরে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে বড় বাইসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষকের নাম শাহ আলম। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।
আরও পড়ুন: ৮৪ শতাংশ জমি দান করেও প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি মেলেনি, নওয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে তদন্তের দাবি
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ জানিয়েছেন, সোমবার বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির এক সদস্য প্রধান শিক্ষককে মোবাইল ফোনে জানায়, চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীর সাথে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমের অসদাচরণের ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণে, প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
প্রধান শিক্ষক জানান, ছাত্রীর মা বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে শিক্ষক শাহ আলম তাঁর মেয়েকে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য প্রতিদিন ১০ টাকা করে দিতেন। সোমবার শিক্ষক শাহ আলম ব্যক্তিগতভাবে ‘ওয়াশরুমে যাও’ লিখে ওই ছাত্রীর উদ্দেশ্যে দেখান। এতে ভীত হয়ে, ছাত্রীটি বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে চলে যায়। পরে, সে তার মা-বাবাকে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ করে।
প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি ওই ছাত্রীর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলি এবং তাঁদের যথাযথ বিচারের আশ্বাস দিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরে আসি।' অফিসে প্রবেশ করার পর, ওই ছাত্রীর চাচা সৌরভ সরকার ও বাবুসহ ১০-১২ জন বহিরাগত এসে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে মারধর করতে শুরু করেন। পরে, আমরা তাঁকে উদ্ধার করে বহিরাগতদের অফিস থেকে বের করে দিই। কিন্তু তারা বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে আবারও হামলাকারীরা চেষ্টা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শাহ আলম পিটিআই প্রশিক্ষণ শেষ করে মাত্র তিন মাস আগে বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। এর আগে, এই ধরনের অভিযোগ আমরা তাঁর বিরুদ্ধে পাইনি।’
আরও পড়ুন: আইজিপি: দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুলিশ
এই ঘটনার পর, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি প্রদান করা হয়। ওই চিঠিতে ভুক্তভোগী ছাত্রীর অভিযোগপত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে, চিঠিতে কোনো স্বাক্ষর নেই এবং কার কাছে আবেদন করা হচ্ছে, সেটিও উল্লেখ করা হয়নি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষক শাহ আলম দীর্ঘদিন ধরে ওই ছাত্রীর গায়ে হাত দিতেন এবং দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ১০ টাকা করে দিতেন। ওই শিক্ষক সোমবার নিজের হাতে ‘ওয়াশরুমে যাও’ লিখে ছাত্রীর কাছে দেখান। এতে ভীত হয়ে, ছাত্রীটি ওয়াশরুমে না গিয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে চলে যায়। চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, একই ধরনের আচরণ অন্য সহপাঠীদের সঙ্গেও করা হয়েছে।
তবে, চিঠির ভাষা, শব্দচয়ন, স্বাক্ষর না থাকা এবং চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীর হাতে লেখা কী নয়, এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চর্চা চলছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলের অনেকেই। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সুখদেব বিশ্বাস বলেন, ব্যক্তিগত কাজে থাকায় তিনি ছাত্রীর বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু অন্যদের কাছ থেকে শুনেছেন, শিক্ষক ওই ছাত্রীকে ওয়াশরুমে যেতে বলেছিলেন এবং সেখানে তাঁর গায়ে হাত দিয়েছিলেন।
তবে, ঐ ছাত্রী পুলিশের বা বিদ্যালয়ের কাছে দেওয়া অভিযোগপত্রে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে গায়ে হাত দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেনি। এই ব্যাপারে জানতে চাইলে সুখদেব বিশ্বাস বলেন, শিক্ষককে মারধরের পর বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে তিনি এই কথা শুনেছেন। এর বেশি তিনি জানেন না।
আরও পড়ুন: পোলিওমুক্ত বিশ্ব গড়তে প্রতিটি শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে: চসিক মেয়র
শিক্ষক শাহ আলম হামলায় অভিযোগ উঠছে। তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি বিদ্যালয়ে এসে হঠাৎ শুনেছি যে, আমি কি এমন একটি কাজ করেছি। পরে, প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাড়িতে বিস্তারিত জানার জন্য যান। তিনি বিদ্যালয়ে ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ১০-১২ জন আমাকে বেধড়ক মারধর করেন। আমি একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের সাথে কীভাবে আমি আপত্তিকর আচরণ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। শিক্ষার্থীদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কেউ আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করবে, তা আমি ভাবতেও পারিনি।’
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, স্থানীয়রা শিক্ষক শাহ আলমকে বিদ্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নিয়েছে। থানায় নেওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ইসিজি করানো হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার সাথে সাথে শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ইউএনও রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘শিক্ষককে মারধর ও অবরুদ্ধ করার বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে জানতে পারি, ১০-১২ জন মিলে ওই শিক্ষককে মারধর করেছে এবং স্থানীয়রা ওই সময় এক ছাত্রীর সাথে শিক্ষকের নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে তদন্ত করা হবে। আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।
আরও পড়ুন: খুলনায় তিন মণ ঘোড়ার মাংসসহ বিক্রেতা আটক, তিন মাসের কারাদণ্ড
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন