১১:১০ এম
॥ এস এম আশিকুজ্জামান ॥
ঢাকা, ২ অক্টোবর, ২০২৬ : মানসম্মত পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবী তালিকাভুক্তি, পেশাগত অসদাচরণের জন্য নিজেদের ট্রাইব্যুনালে বিচার এবং মৃত্যু পরবর্তী আর্থিক অনুদানের নিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বর্তমানে পেশাজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার-১৯৭২’ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মূল দায়িত্ব দেশের নতুন আইনজীবীদের মানসম্পন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা।
আরও পড়ুন: মিরপুরে পুলিশের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ
আইনজীবী তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া
আইন বিষয়ে স্নাতক বা এলএলবি ডিগ্রিধারী আইন পেশায় যুক্ত হতে ইচ্ছুক হলে প্রথমে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন আইনজীবীর অধীনে ছয় মাসের শিক্ষানবিশকাল সম্পন্ন করতে হয়। শিক্ষানবিশকাল শেষে বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব। পরীক্ষার প্রথম ধাপে নৈর্ব্যক্তিক (এমসিকিউ) পরীক্ষা, পরবর্তীতে লিখিত এবং সর্বশেষ মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আইনজীবী সনদ অর্জনকারীরা জেলা আদালতে আইন পেশা পরিচালনার সুযোগ পান।
অন্যদিকে, হাইকোর্টের আইনজীবী হতে হলে জেলা আদালতে দুই বছর আইন পেশা পরিচালনাকারী আইনজীবীকে বার কাউন্সিলের হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। তবে এলএলএম ডিগ্রিধারী আইনজীবীরা জেলা আদালতে এক বছর আইন পেশা পরিচালনার পর হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষা দিতে পারেন। হাইকোর্ট পারমিশনের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হলে আইনজীবীরা হাইকোর্টে আইন পেশা পরিচালনার জন্য বার কাউন্সিল থেকে সনদ লাভ করেন।
আইনজীবী তালিকাভুক্তির বিষয়ে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস’কে জানিয়েছেন, আইনজীবী তালিকাভুক্তিকরণ বার কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান কাজ। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়াটি নিয়মিত ছিল না। তবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর যতদূর সম্ভব এটি নিয়মিত করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে আইনজীবী তালিকাভুক্তির দুটি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফেনীতে সাংবাদিককে মারধর ও হত্যার হুমকির অভিযোগে সাবেক কাউন্সিলর আটক
ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতি’- এমন কথিত ধারণাকে দূরে ঠেলে আইন পেশার মান মর্যাদা বৃদ্ধি ও মেধার চর্চা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আইনজীবী তালিকাভুক্তির সিলেবাসকে যুগোপযোগী করে সংশোধন করা এবং বছরে দুটি পরীক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নের মান উন্নত করার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। প্রকৃত মেধাবীদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ বিষয়ে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সারা দেশে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে আইনজীবীদের ট্রেনিংয়ের জন্য বার কাউন্সিলকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আইনজীবীরা আগামীতে বার কাউন্সিলের ট্রেনিং থেকে উপকৃত হবেন।
বার কাউন্সিল গঠন
বার কাউন্সিল ১৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাকি ১৪ জন সদস্যের মধ্যে সাধারণ আসনে (৭টি) সারা দেশের আইনজীবীদের সরাসরি ভোটে ৭ জন সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া সারা দেশের স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে (আইনজীবী সমিতি) ৭টি গ্রুপে (গ্রুপ-এ থেকে গ্রুপ-জি) ভাগ করা হয়। প্রতিটি গ্রুপ থেকে আইনজীবীদের ভোটে একজন করে মোট সাতজন সদস্য নির্বাচিত হন। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ১৪ জন সদস্য তাদের প্রথম সভায় নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে ‘ভাইস-চেয়ারম্যান’ হিসেবে নির্বাচন করেন।
আরও পড়ুন: সংবাদপত্রের মালিক পেয়ার মিয়াঁকে ১০ দফা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ এর ক্ষমতাবলে গত ৩০ জুন ১৫ সদস্যের একটি অ্যাড-হক বার কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এই অ্যাডহক বার কাউন্সিল ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এক বছর মেয়াদে কার্যকর থাকবে বলে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বার কাউন্সিলে ১০ কমিটি
বার কাউন্সিলের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ১০টি কমিটি রয়েছে। এই কমিটিগুলো হলো- এক্সিকিউটিভ কমিটি, এনরোলমেন্ট কমিটি, ফিন্যান্স কমিটি, লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি, ল রিফর্ম কমিটি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লিগ্যাল এইড কমিটি, হাউস কমিটি, রিলিফ কমিটি, রোল অ্যান্ড পাবলিকেশন কমিটি এবং কমপ্লেইন্ট অ্যান্ড ভিজিল্যান্স কমিটি।
আইনজীবী তালিকাভুক্তি ও পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ এনরোলমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। এছাড়া প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্টের অপর দুজন বিচারপতি এই কমিটির সদস্য হিসেবে থাকেন। অ্যাটর্নি জেনারেল (পদাধিকারবলে) এবং বার কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে নির্বাচিত একজন আইনজীবীও এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্য হন।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢামেকে আনা হলো আনিসুল, পলক ও মামুন
আইনজীবীর অসদাচরণ বিচারে ট্রাইব্যুনাল
আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণের বিচার করার জন্য বার কাউন্সিলের অধীনে একটি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার কার্য পরিচালনা করে।
সাক্ষ্য গ্রহণ, সমন জারি এবং অন্যান্য কার্যধারার ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধির ক্ষমতা রয়েছে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের। পেশাগত অসদাচরণের জন্য দোষী প্রমাণিত হলে আইনজীবীর বিরুদ্ধে মূলত তিন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এগুলো হলো- তিরস্কার বা ভর্ৎসনা, আইনজীবী সনদ সাময়িক বাতিল বা স্থগিতকরণ অথবা পেশা থেকে স্থায়ী বহিষ্কার। তবে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।
আইনজীবীদের অসদাচরণের বিচারের বিষয়ে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাসস’কে জানিয়েছেন, কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ আসলে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে অভিযুক্ত আইনজীবীকে তার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ব্যক্তিকে তার অভিযোগ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে বার কাউন্সিলে পাঁচটি ট্রাইব্যুনাল পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করছে এবং অনেক অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে। দেশের পেশাজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল একটি ‘রোল মডেল’ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
আরও পড়ুন: সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন
আর্থিক অনুদানে বেনাভোলেন্ট ফান্ড
কোনো আইনজীবী মৃত্যুবরণ করলে তার নমিনি বা পরিবার বার কাউন্সিলের (বেনাভোলেন্ট ফান্ড) তহবিল থেকে আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকেন। কত বছর চাঁদা দেওয়া হয়েছে সে অনুযায়ী চাঁদা দানকারী আইনজীবীর মৃত্যুদাবির টাকা নির্ধারিত হয়। যেখানে ৪০ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় চাঁদা দানকারীর মৃত্যুদাবি ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেনাভোলেন্ট ফান্ড বিষয়ে বার কাউন্সিলের সচিব (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ কামাল হোসেন সিকদার বাসস’কে জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৭ কর্মদিবসের মধ্যে আইনজীবীর মৃত্যুদাবির টাকার চেক স্ব-স্ব আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন দৃষ্টিনন্দন ১৫ তলা বিশিষ্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবনে আইনজীবীদের জন্য উন্নত মানের রেস্ট হাউজ সুবিধা রয়েছে। আইনজীবীরা নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে এই রেস্ট হাউজে থাকতে পারেন।
আরও পড়ুন: শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠাল আদালত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন