১২:২২ এম
দীর্ঘ ১৭ বছর একটানা ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যখন বাংলাদেশের হাজারো ছাত্র জনতা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, অঙ্গহানি করে, চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ববরণ করে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের অন্যতম আইকন আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও পলায়ন করতে বাধ্য করেছে। দেশে গণতন্ত্র আইনের শাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছে। তার সুফল এখনো পেয়েছে কিনা সেটি জনগণই ভালো জানে। তবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে বর্তমান রাজনৈতিক দল-বিএনপি সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে ক্ষমতাসীন হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মত রাজনৈতিক দল অনেক আসন পেয়ে বিরোধী দলে জায়গা করে নেয়। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পরাজিত শক্তি বসে নেই, দলীয় প্রধান পালিয়ে গেলেও কোন অনুশোচনা ছাড়াই ক্রমাগত নেতাকর্মীদের উস্কানি দিয়ে গোটা দেশ বিশৃঙ্খল করে রাখতে চাইছে। নিজে বারবার ফেরার ঘোষণা দিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল সংকট, গ্যাসের দামে ঊর্ধ্বগতি, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দুর্নীতি লুটপাট অপশাসনের ফলে এবং তার বিভিন্ন দোসর বিভিন্ন পদে আসিন থাকায় সরকারকে বাজার ব্যবস্থায় চরম অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নিম্ন আয়ের মানুষদের নাভিশ্বাস এর সাথে পাশাপাশি যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয় তাহলে দীর্ঘ গণতন্ত্রহীনতা শেষে নতুন ব্যবস্থায় ফেরার জন্য যে স্থিতিশীলতা দরকার তা নতুন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাই ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে আসলে সরকারি দল নাকি বিরোধী দল নাকি অনুশোচনা ছাড়াই দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসতে চাওয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ কাদের লাভ হচ্ছে অথবা কাদের ক্ষতি হচ্ছে তা ভেবে দেখা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরী।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কখনো কেবল শিক্ষার কেন্দ্র ছিল না; এটি ছিল গণতন্ত্র, প্রতিবাদ, অধিকার আদায় ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূতিকাগার। কিন্তু যখন সেই ক্যাম্পাস যুক্তির বদলে শক্তির, বিতর্কের বদলে দখলের এবং মতের বদলে সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত হয়, তখন সবচেয়ে বড় পরাজিত হয় জাতি।
জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। সরকারি সমর্থক ছাত্রসংগঠন, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান, সংঘর্ষ ও উত্তেজনা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ছাত্ররাজনীতি কি আবারও সেই পুরোনো সহিংসতার চক্রে ফিরে যাচ্ছে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—এই সংঘাতের প্রকৃত লাভ কার?
যে দেশ অর্থনৈতিক চাপ, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় যদি প্রতিদিন সংঘর্ষের সংবাদ শিরোনাম হয়, তবে লাভ কোনো ছাত্রসংগঠনের নয়। ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীর, ক্ষতি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের, ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের।
ক্ষমতাসীনদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক পরিবেশকে সহনশীল রাখাও তাদের কর্তব্য। অন্যদিকে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোরও মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের নামে সহিংসতা বা প্রতিশোধের রাজনীতি জনসমর্থন নয়, বরং জনআস্থা হারানোর পথ তৈরি করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস একটি শিক্ষা দেয়—যখন গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন সেই বিভাজনের সুযোগ নেয় তৃতীয় শক্তি। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এমন শক্তির জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যারা বিশৃঙ্খলাকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চেয়েছে। তাই আজ যারা ক্যাম্পাসকে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তারা হয়তো সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে চাইছেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হচ্ছে পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, বিচারপতি, শিক্ষক ও চিন্তাবিদ তৈরির প্রতিষ্ঠান। সেখানে যদি বইয়ের বদলে লাঠি, গবেষণার বদলে গোষ্ঠীসংঘর্ষ এবং যুক্তির বদলে পেশিশক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে হারবে বাংলাদেশই।
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা নয়; বরং ছাত্ররাজনীতিকে সভ্য, যুক্তিনির্ভর ও গণতান্ত্রিক করার সময় এসেছে। ক্যাম্পাসে মতের লড়াই থাকবে, কিন্তু অস্ত্রের নয়; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু রক্তপাতের নয়।
আজ যারা ছাত্রনেতা, কাল তারাই দেশের নেতৃত্বে আসবেন। যদি তাদের রাজনৈতিক শিক্ষার প্রথম পাঠই হয় সংঘর্ষ, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশও সংঘাতের উত্তরাধিকার বহন করবে। আর যদি তাদের প্রথম পাঠ হয় সহনশীলতা, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তবে সেই বাংলাদেশ হবে আরও শক্তিশালী। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একটাই—ক্যাম্পাসে প্রতিদিন উত্তাপ ছড়িয়ে কি কেউ সত্যিই জয়ী হয়?
না। জয়ী হয় কেবল অস্থিরতা। পরাজিত হয় শিক্ষা, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশ।
আরও একটি বাস্তবতা আজ জনপরিসরে আলোচিত। দেশের বাইরে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন জাগছে—দেশের অভ্যন্তরে যদি গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যকার সংঘাতে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেই বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ কি অতীতের শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে না?
রাজনীতির ইতিহাস বলে, প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় বিজয় অনেক সময় তার নিজের শক্তিতে নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বীর আত্মঘাতী বিভক্তিতে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি সংঘর্ষ, প্রতিটি রক্তাক্ত ছবি, প্রতিটি প্রতিহিংসার ঘটনা যেন অদৃশ্য কারও রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত না হয়—সেই সতর্কতা আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নিজেদের সমর্থক ছাত্রসংগঠনসহ সব রাজনৈতিক পক্ষকে সংযম, সহনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাখতে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া। কারণ ক্ষমতার প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে দমনে নয়, নিজের পক্ষকেও আইনের সীমার মধ্যে রাখার সক্ষমতায়।
আজ যদি আবেগ প্রজ্ঞাকে হারিয়ে দেয়, যদি দলীয় আনুগত্য রাষ্ট্রের স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়, যদি ক্যাম্পাস আবারও সংঘর্ষের কারখানায় পরিণত হয়, তবে তার মূল্য শুধু একটি সরকার বা একটি দলের নয়—সমগ্র বাংলাদেশকে দিতে হবে।
সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। উত্তপ্ত রাজনীতিকে শীতল প্রজ্ঞায় নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ এখনো আছে। সেই সুযোগ হারিয়ে গেলে ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে, ইতিহাস কাদের সুযোগ করে দেবে, আর কাদের কঠিন মূল্য দিতে হবে—তার উত্তর সময়ই লিখবে। তবে একটি সত্য আজই স্পষ্ট: বিভক্তির রাজনীতি কখনো জাতিকে শক্তিশালী করে না; বরং সেই ফাটল দিয়েই অনিশ্চয়তা প্রবেশ করে রাষ্ট্রের ভেতরে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন