১০:৩৪ এম
রাজধানীকে একটি পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই নগরীতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে পরিচ্ছন্নতা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা খাতের জন্য ৩২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের বরাদ্দের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে সিটি কর্পোরেশনের বরাদ্দ ছিল ৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা, পরবর্তীতে সংশোধিত আকারে বরাদ্দটি ৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় এসে দাঁড়ায়।
ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, সরকার ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ প্রকল্পের বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নগর পরিচ্ছন্নতার পুরো ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে শিফট ভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সড়কে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্বও সুস্পষ্টভাবে বণ্টন করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের তদারকির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে পৃথক ‘মনিটরিং টিম’ গঠন করা হয়েছে, যাতে মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে ট্রাকচাপায় অটোভ্যান চালক আজিজুল হক নিহত
তিনি বলেন, নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তনকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে ডিএসসিসি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের জোরদার করেছে, বিডি ক্লিন ও সাজেদা ফাউন্ডেশন-এর সহযোগিতায় যত্রতত্র ময়লা না ফেলে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একইসাথে পরীক্ষামূলকভাবে মতিঝিল এলাকায় সিটি ইন্সপেক্টর নিয়োগ দিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, মতামত ও পরামর্শ দ্রুত গ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ‘ক্লিন কেয়ার’ মোবাইল অ্যাপ ও হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন করা হচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও নান্দনিকতার সমন্বয় ঘটাতে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) গুলোকে আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ছয়টি এসটিএসকে উন্নত স্যানিটেশন সুবিধাসহ পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় রূপান্তর করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে সব এসটিএসকে একই মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজধানীর সবচেয়ে বড় বর্জ্য ফেলার স্থান মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল-এ মিথেন গ্যাস থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও পরিবেশ দূষণ রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ল্যান্ডফিলের ওপর মাটির আচ্ছাদন দেওয়ার পাশাপাশি এটিকে আধুনিক ‘রিসোর্স সার্কুলেশন পার্ক’-এ রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে একটি অত্যাধুনিক কম্পোস্ট প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে, যা জৈব বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
আরও পড়ুন: মুকসুদপুরে পিকআপচাপায় বাবা-মেয়ের প্রাণ গেল
বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে একযোগে স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে ডিএসসিসি। বর্ষা শুরুর আগেই নগরীর নর্দমা, বক্স-কালভার্ট ও খাল থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। ৭৫টি ওয়ার্ডে ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা বা হটস্পট চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
ভারী বৃষ্টিপাতের সময় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য পোর্টেবল পাম্প ও সাকার মেশিন মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তারা বৃষ্টির সময় ড্রেন এবং নর্দমার মুখ পরিষ্কার রেখে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে।
জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য ডিএসসিসি এলাকায় আটটি নতুন আউটলেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সায়েন্স ল্যাব-নিউ মার্কেট-আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট-শিক্ষা বোর্ড থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আউটলেট নির্মাণে সরকারের অনুমোদন মিলেছে। বাস্তবায়ন শেষে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
এছাড়া জিয়া সরণি খাল, কুতুবখালী খালসহ ডিএসসিসির আওতাধীন সব খাল নিয়মিত পরিষ্কার, পুনঃখনন এবং সংস্কারের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ৪৬
নগরীর দীর্ঘমেয়াদি ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডের জন্য ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডাব্লিউএম)-কে একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের নগর সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বাসস’কে জানিয়েছেন, পরিচ্ছন্নতা খাতে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ, প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন- এই চারটি খাতকে কেন্দ্র করে বাস্তবায়িত কর্মসূচিটি রাজধানীর দক্ষিণ অংশকে আরও পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আসবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন