০৩:০৩ পি.এম
রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া উপদ্বীপের দক্ষিণ উপকূলের অবকাশযাপন কেন্দ্র সিমেইজ। সেখানকার আইসক্রিম বিক্রেতা আনাতোলির দিন এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। এক সময় তার দোকানে প্রতিদিন ৪০০টি পর্যন্ত আইসক্রিম বিক্রি হতো। কিন্তু এ গ্রীষ্মে ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার কারণে পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ করে কমে গেছে।
সিমেইজ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
প্রায় আড়াই হাজার মানুষের ছোট উপকূলীয় জনপদ সিমেইজের বাসিন্দা আনাতোলি এএফপিকে বলেন, এ মৌসুমে লোকসানে পড়তে হচ্ছে। বলা যায়, ব্যবসার কোনো মৌসুমই নেই।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপের স্পিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, আলোচনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে
এক সময় প্রতিবছর লাখো রুশ পর্যটকের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ক্রিমিয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় উপদ্বীপের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় পর্যটন শিল্প কার্যত ভেঙে পড়েছে।
গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় হোটেল বুকিং ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। রেস্তোরাঁ ও সুইমিং পুলগুলোও প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।
খাতটিকে সহায়তা দিতে রুশ সরকার পর্যটন খাতের কর্মীদের তিন মাসের বেতনের সমপরিমাণ এককালীন অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ অর্থ ন্যূনতম মজুরির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
আনাতোলি বলেন, আগের ব্যবসার সামান্য অংশ দিয়ে এখন তিনি কোনোমতে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। আমরা এখনও টিকে আছি। কারণ সবকিছু আগেই প্রস্তুত করা ছিল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম স্থলবাহিনী সংলাপ ঢাকা সেনানিবাসে সফলভাবে সম্পন্ন
যন্ত্রপাতি, মেরামত, লাইসেন্স ও কর—সবই আগেই পরিশোধ করা হয়েছে।
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, সারা বছরের রোদ এবং সবুজ জলপাই বাগানের কারণে ক্রিমিয়ার দক্ষিণ উপকূল অনেকটাই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে কৃষ্ণসাগর তীরের এ উপদ্বীপ দখল করে রাশিয়া।
সোভিয়েত আমল থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম রুশ নাগরিক ছুটি কাটাতে ক্রিমিয়ায় আসতেন। তাদের অনেকেই ক্রিমিয়াকে তাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিমেইজের একটি বিলাসবহুল হোটেলের কর্তৃপক্ষ জানায়, পর্যটক ফেরাতে তারা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন: গণতন্ত্রের শর্ত ও রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্ব: তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক
হোটেলের এক ব্যবস্থাপক বলেন, ‘সপ্তাহের শেষে একটু ভিড় হয়।’
এএফপির প্রতিবেদক দেখেছেন, হোটেলের হাঁটার পথ, রোদ পোহানোর চেয়ার এবং রেস্তোরাঁর খোলা বসার জায়গা ফাঁকা পড়ে রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু থেকে ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের হামলায় এক শিশুসহ এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এদিকে ক্রিমিয়ার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলোতে ড্রোন হামলায় সেভাস্তোপোলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তেল ডিপোতে হামলার পর গত মাসে রুশ-নিয়োগকৃত কর্তৃপক্ষ জ্বালানি বিক্রিও স্থগিত করেছিল। তবে ঝুঁকি সত্ত্বেও কিছু পর্যটক নিরুৎসাহিত হননি।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, আগের রাতে সিমেইজ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি আবাসিক ভবনে ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হানে। এতে ১৭ জন আহত হন।
ইউলিয়া নামে এক পর্যটক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কের্চ সেতু হয়ে ট্রেনে ক্রিমিয়ায় এসেছেন। রাশিয়া থেকে ক্রিমিয়ায় যাওয়ার এটিই এখন কার্যত একমাত্র পথ। কারণ রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড দিয়ে সড়কপথে যাতায়াত ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি দুবার ড্রোনের শব্দ শুনেছি। এরপর আর কিছু নয়।’
রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চল থেকে সড়কপথে আসা আরেক পর্যটক ভ্লাদিস্লাভ বলেন, পথে জ্বালানি নাও পাওয়া যেতে পারে—এ আশঙ্কায় তিনি পেট্রলভর্তি জেরিক্যান সঙ্গে এনেছেন।
আরও পড়ুন: ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান শাকিলের জানাজায় এমপির বিরুদ্ধে
ইউলিয়ার মতো তিনিও জানান, নিয়মিত ড্রোনের শব্দে তিনি এখন অভ্যস্ত। তাই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন।
রাশিয়া ইউক্রেনের শহরগুলোতে নিয়মিত কয়েক শত ড্রোন হামলা চালানোর জবাবে ইউক্রেনও প্রায় প্রতি রাতেই রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শ ড্রোন পাঠায়।
ভ্লাদিস্লাভ বলেন, ‘দেখুন, আমাদের ওপর দিয়েও ওগুলো উড়ে যায়। সকাল সাতটায় ঘুম থেকে ওঠার সময় হোক কিংবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়—সব সময়ই ওগুলো মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। তাই কেউই নিরাপদ নয়।
ইউক্রেন বলছে, শান্তি আলোচনায় মস্কোকে চাপ দিতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কসোভোতে মুসলিম দেশ হিসেবে অন্য এক দৃষ্টান্ত: ক্যাথলিক নারী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট
রুশ সরকার পর্যটন খাতের কর্মী, ট্রাভেল এজেন্ট, ট্যুর অপারেটর এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের জন্য এককালীন সহায়তা হিসেবে ৪৩০ কোটির বেশি রুবল (৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার) বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ সহায়তা শুধু পর্যটন খাতের জন্য প্রযোজ্য।
সেভাস্তোপোলের উত্তরের একটি এলাকা থেকে বেড়াতে আসা লিলিয়া বলেন, বেসরকারি খাত এখন সংগ্রাম করছে।
সিমেইজের সৈকতে বসে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি এমন লোকজনকে চিনি, যারা ড্রাইভিং স্কুল চালান। পেট্রলের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের ব্যবসা পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে। ব্যবসা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন