০৩:১৪ পি.এম
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে স্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কত বাড়তে পারে, এ নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট কৌতূহল।
স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখন পর্যন্ত মোট আটবার পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। যার সবশেষটি হয়েছিল ২০১৫ সালে। এর পর থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট হারে (বর্তমানে পাঁচ শতাংশ) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি হলেও, নতুন করে আর আনুষ্ঠানিকভাবে বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসেনি। নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু মূলত মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য নতুন পে স্কেলের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে নবম জাতীয় পে কমিশন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেখানে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। বর্তমানের যে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, সেটিকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রস্তাবিত হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।
আরও পড়ুন: ‘ক্ষমতা বাড়লো বা কমলো, তার চেয়ে জরুরি শিক্ষা-স্বাস্থ্যের সংস্কার ও কর্মসংস্থান’
কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ের জন্য একটি পৃথক কমিটি গঠন করে বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করে। পে কমিশন প্রতিবেদন দেওয়ার পর থেকেই বেতন বৃদ্ধির শতাংশ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সামনে আসছে।
এক্ষেত্রে অতীতে বাংলাদেশের যে পে স্কেলঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানে কী পরিমাণ বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল, সেই আলোচনাও রয়েছে।
নবম জাতীয় পে স্কেলের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কবে কত বেতন বেড়েছিল, সেই প্রসঙ্গে বলা যায় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পে স্কেল বা বেতন কাঠামো ১৯৭৩ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল। মূলত ওই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলের পে স্কেল ভেঙে একটি নতুন বেতন কাঠামো প্রবর্তন করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
আরও পড়ুন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতেই হবে, বিকল্প নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
দশটি গ্রেড রেখে ঘোষিত ওই পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ছিল ১৩০ টাকা, আর সর্বোচ্চ বেতন ছিল দুই হাজার টাকা। যদিও ওই সময় পুরোপুরি এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। যেখানে ১০টি গ্রেডের পরিবর্তে ২১টি গ্রেড বা ধাপের প্রবর্তন করা হয়।
ওই পে স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ছিল ২২৫ টাকা, আর সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে ৭৩ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল পঞ্চাশ শতাংশ।
১৯৮৫ সালে তৃতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। যেখানে একশ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ওই পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন, ১২২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে পাঁচশ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে শতভাগ বাড়িয়ে ছয় হাজার টাকার নির্ধারণ করা হয়েছিল।
১৯৯১ সালে ঘোষিত চতুর্থ পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন নয়শ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যা আগের পে স্কেলের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি ছিল। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে দশ হাজার টাকা করা হয়।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রী: স্কুল ও মাদরাসার বোর্ড পরীক্ষা একই প্রশ্নপত্রে
বাংলাদেশে পঞ্চম পে স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। ওই পে স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার পাঁচশ টাকা করা হয়।
সর্বোচ্চ ২৩ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন দুই হাজার ৪০০ টাকা করা হয় ২০০৫ সালে ঘোষিত ষষ্ঠ পে স্কেলে। এসময় সর্বোচ্চ বেতনভুক্তদের ৫৩ শতাংশ এবং সর্বনিম্নদের ৬০ শতাংশ বেতন বেড়েছিল।
২০০৯ সালে ঘোষণা করা হয় সপ্তম পে স্কেল। যেখানে সর্বনিম্ন গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়িয়ে করা হয় চার হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবশেষ বেতন কাঠামো অর্থাৎ অষ্টম পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১০১ শতাংশ বেড়ে আট হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৯৫ শতাংশ বেড়ে ৭৮ হাজার টাকায় হয়েছিল।
আরও পড়ুন: এনসিপির কমিটিতে ৩০ বছরের নিচে কাউকে রাখা হবে না
নবম পে স্কেলের কাজ কতদূর? অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার প্রায় এক যুগ পরে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির একটি প্রতিবেদন জমা দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত নবম জাতীয় পে কমিশন। যদিও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে বেতন কাঠামোর সুপারিশ প্রণয়নে ২১ এপ্রিল একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে সরকার।
সংসদের বাজেট অধিবেশনে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর পর থেকেই বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ দেখা দিয়েছে, তবে এখনও নবম পে স্কেলের চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ফোরামে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। বুধবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, নবম পে স্কেলের গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।
আরও পড়ুন: দেশ মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে: নাহিদ ইসলাম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন