০৭:২৯ পি.এম
মানববর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল, কয়লা ও তরল সার উৎপাদনের সম্ভাবনা খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকরা তৈরি করেছেন। তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে এক টন মানববর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লিটার জ্বালানি তেল ও ৪৫ থেকে ৫০ কেজি কয়লা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। একই প্রক্রিয়ায় বর্জ্য থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও জৈব উপাদান পুনরুদ্ধার করে প্রয়োজনীয় পরিশোধনের মাধ্যমে তরল সার উৎপাদন করা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষক দলের দাবি, এই প্রযুক্তিতে বর্জ্যের কোনো অংশই ফেলনা থাকে না। ফলে মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জ্বালানি ও কৃষি উপকরণ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাঁরা গবেষণাটিকে ‘শূন্য বর্জ্য প্রযুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে গবেষণাটি ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমে একাডেমিক গবেষণা হিসেবে কাজটি চললেও পরে তা আরো কাঠামোবদ্ধ হয়ে ‘স্লাজ টু অয়েল’ প্রকল্পে রূপ নেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২২ সালের এপ্রিলে।
আরও পড়ুন: কৃষিঋণে খেলাপি ১৯ হাজার কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকে বাড়ছে
‘স্লাজ টু অয়েল’ প্রকল্পের গবেষণা পর্যায়ে প্রধান সরকারি অর্থায়নকারী ছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল। প্রকল্পটির বাজেট ছিল প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ টাকা।
এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটিএন এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ‘স্লাজ টু অ্যাসফাল্ট’ ও ‘মাল্টি-স্টেজ কো-এইচটিএল’ নামে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এসব প্রকল্পের মোট বাজেট ছিল প্রায় ৪৩ লাখ টাকা।
বর্তমানে গবেষণাটি ‘বাংলাদেশ বায়োরিফাইনারি ও বায়োক্রুড উদ্ভাবন কেন্দ্র’ নামে আরো বিস্তৃত পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণ প্রকল্পের ১৩৭৩৩ নম্বর উপ-প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণ কর্মসূচিটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রকল্পের বাজেট প্রায় ৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং এর মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের সঙ্গে প্রায় ৫ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে গবেষণাগার উন্নয়নের জন্য।
আরও পড়ুন: অক্টোবরের ২৪ দিনে রেমিট্যান্স ২১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার
এক টন বর্জ্যে কত তেল
গবেষকদের তৈরি প্রযুক্তির মাধ্যমে মানববর্জ্যকে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব অপরিশোধিত তেলে রূপান্তর করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় বর্জ্য শুকানোর প্রয়োজন হয় না, ফলে ভেজা মানববর্জ্য সরাসরি প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব।
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক টন মানববর্জ্য থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লিটার জ্বালানি তেল পাওয়া সম্ভব। একই পরিমাণ বর্জ্য থেকে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কেজি কয়লাও উৎপাদন করা যায়।
তবে প্রক্রিয়াটি শুধু তেল ও কয়লা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তেল ও কঠিন অংশ আলাদা করার পর যে জলীয় অংশ পাওয়া যায়, সেখান থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও বিভিন্ন জৈব উপাদান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। প্রয়োজনীয় পরিশোধনের পর এসব উপাদান ব্যবহার করে তরল সার উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: সবুজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে গুরুত্বারোপ পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর
অর্থাৎ এক টন মানববর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার পর একদিকে জ্বালানি তেল, অন্যদিকে কয়লা এবং জলীয় অংশ থেকে তরল সার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষকদের ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে বর্জ্য হিসেবে আবার নতুন কোনো বড় অংশ ফেলে রাখতে না হয়।
১০০ টাকার নিচে হতে পারে প্রতি লিটার তেলের খরচ।
গবেষকদের প্রাথমিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও আশার কথা উঠে এসেছে। বর্তমান পরীক্ষামূলক পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ানো গেলে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের উৎপাদন খরচ ১০০ টাকার নিচে রাখা সম্ভব হতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।
তবে এটি এখনো চূড়ান্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন খরচ নয়। বড় পরিসরে উৎপাদন, কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও তাপের চাহিদা, যন্ত্রপাতির ব্যয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষামূলক কারখানায় দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনের পর প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
আরও পড়ুন: গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ২ দিনের মাথায় বন্ধ যমুনা সার কারখানার উৎপাদন
গবেষকদের মতে, দেশের উপযোগী বর্জ্যের প্রায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ এই প্রযুক্তির আওতায় আনা গেলে জাতীয় জ্বালানি চাহিদার আনুমানিক ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণে অবদান রাখা সম্ভব হতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি বছরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই হিসাব নির্ভর করবে দেশে কী পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব, তার কতটা প্রযুক্তির আওতায় আনা যায় এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে উৎপাদন কতটা দক্ষতার সঙ্গে করা যায় তার ওপর।
পরীক্ষাগার থেকে বড় প্লান্টের পথে
গবেষণার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম একটি ধারাবাহিক পরীক্ষামূলক কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকদের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের একটি বাণিজ্যিক মানের কারখানা স্থাপনে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
আরও পড়ুন: প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৩.৮৯ শতাংশে নেমে এসেছে
এই কারখানা স্থাপন করা গেলে টানা ১২ থেকে ১৮ মাস প্রযুক্তিটি পরিচালনা করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ, জ্বালানি দক্ষতা, নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতির স্থায়িত্ব এবং নিয়মিত উৎপাদনের সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হবে।
গবেষকদের পরিকল্পনায় সৌর তাপ ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাতকরণের আগে বর্জ্য উত্তপ্ত করার ব্যবস্থাও যুক্ত করার কথা রয়েছে। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় তাপের একটি অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি চাহিদা আরও কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পরীক্ষামূলক কারখানার ফলাফলের ভিত্তিতে বড় আকারের বাণিজ্যিক কারখানার নকশা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। সফল হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের কারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্জ্য থেকে সম্পদ
আরও পড়ুন: বিদেশি কার্ডের আয়ের ১৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে রাখতে পারবেন ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ তৈরি হয়। এসব বর্জ্যের বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা না গেলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
গবেষকদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে সেই বর্জ্যকেই কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানববর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল ও কয়লা উৎপাদনের পাশাপাশি এর জলীয় অংশ থেকে কৃষিতে ব্যবহারের উপযোগী তরল সার তৈরির সুযোগ থাকায় একই বর্জ্য থেকে একাধিক পণ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে সফল হলে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান, দেশীয় যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশল শিল্পের বিকাশ এবং বর্জ্যভিত্তিক নতুন শিল্পখাত তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে গবেষকরা বলছেন, পরীক্ষাগার ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ের সাফল্যকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়ার জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় পরিসরে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন, প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানির মান, নিরাপত্তা এবং কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কুয়েটের গবেষকদের উদ্ভাবিত ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন (এইচটিএল) প্রযুক্তি মানববর্জ্যকে জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের সম্ভাবনাময় দেশীয় উৎসে রূপান্তরের পথ দেখাচ্ছে। দেশীয় মেধা ও প্রকৌশল দক্ষতায় বিকশিত এ প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশে অবদান রাখতে পারে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক পরীক্ষামূলক কারখানায় উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানির মান ও নিরাপত্তা যাচাই করে প্রযুক্তিটিকে বৃহৎ পরিসরে এগিয়ে নেওয়া।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন