০৬:২৬ পি.এম
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রধান উদ্দেশ্য হলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করা এবং ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু এই অনুসন্ধানের পথে যদি সাংবাদিককে ব্যক্তি আক্রমণ করা হয়, সামাজিক প্রতিপন্ন হওয়া কিংবা 'ভুয়া সাংবাদিক' আখ্যা দিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড় করানো হয়, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত সম্মানহানির বিষয় নয়। এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করে। পিরোজপুরে একটি এতিমখানা-মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা ঠিক এমনই আলোচনা তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল থেকে দুই সাংবাদিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট এতিমখানা-মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন। তাদের অনুসন্ধানের মূল বিষয় ছিল প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত এতিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বাইরের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, খাদ্যের মান, সরকারি ও দাতাদের অনুদানের ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র। অভিযোগকারীদের দাবি, তথ্য সংগ্রহ চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে পিরোজপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই কথিত নেতা নাঈম এবং এশিয়ান টিভির সাবেক পরিচয়ধারী অমিত হাওলাদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের 'ভুয়া সাংবাদিক' বলে প্রচার করেছেন। এতে তাদের পেশাগত পরিচিতি ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুবিধা বা উৎকোচ না পাওয়ার কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বরিশাল থেকে যাওয়া দুই সাংবাদিকের একজন রাফি, যিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি একটি মানবিক ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এতিম ও অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। অপরজন মো. নজরুল ইসলাম খান, যিনি দীর্ঘদিন জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করার পর বর্তমানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘জন দিগন্ত’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের ভাষ্য হলো, জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে উল্টো তাদের পেশাগত পরিচয় ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে শুধু তাদের ব্যক্তিগত সম্মানহানি হয়নি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবেশও হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট এতিমখানা-মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে অসংগতি ছিল এবং কিছু বক্তব্য পূর্বপ্রস্তুত বা শেখানো বলে মনে হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য নিয়ে দ্বিমত থাকলে তার উত্তর হওয়া উচিত তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে। সাংবাদিককে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো কিংবা 'ভুয়া সাংবাদিক' আখ্যা দিয়ে হেয় করার প্রবণতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিমূলক সমাজব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। তাদের মতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক সময় অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। কিন্তু প্রশ্নের জবাব যদি তথ্য দিয়ে না দিয়ে ব্যক্তি আক্রমণের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে প্রকৃত বিতর্ক আড়ালে থেকে যায় এবং জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার পর স্থানীয় সাংবাদিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়, তাহলে প্রকৃত এতিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা, খাদ্যের মান, অনুদানের ব্যবহার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশে আপত্তি কোথায়? অভিযোগকারীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, শুধু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ নয়, অনুসন্ধানে উত্থাপিত বিষয়গুলোরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক। কারণ সত্য অনুসন্ধানের পরিবেশ যদি ভয়, চাপ কিংবা অপপ্রচারের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হয়, তবে জনগণের তথ্য জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন