০২:১৭ এম
প্যারিসের লাতিন কোয়ার্টারের ঐতিহাসিক এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা গ্র্যান্ড মসজিদ ২০২৬ সালে শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। একশ বছরের এ পথচলায় এটি এক সংগে একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই যুদ্ধে ফ্রান্সের পক্ষ হয়ে লড়াই করেছিলেন বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম সৈনিকরা, যারা উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছিলেন। যুদ্ধের সময় তাদের মধ্যে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি ও স্মৃতি সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশেই প্যারিসে একটি বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট গ্র্যান্ড মসজিদ নির্মাণের অনুমোদন দেয় এবং কয়েক বছরের নির্মাণকাজ শেষে ১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদ। উদ্বোধন করেন তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ দুমের্গ। মসজিদের প্রথম রেক্তর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সি কাদ্দুর বেংগাব্রিত।
আরও পড়ুন: সবজি কিনতে গেলে মনে হয় মাংস কিনছি, গরু-ইলিশের কথা মানুষ ভুলে যাবে: আসিফ মাহমুদ
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গ্র্যান্ড মসজিদ ফ্রান্সের মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। সময়ের সাথে এটি বর্তমানে ফ্রান্সে মুসলিম ঐতিহ্য ও উপস্থিতির একটি পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্যারিসের এ মসজিদের স্থাপত্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর নকশায় আন্দালুসীয় ও মুরিশ স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব রয়েছে। ৩৩ মিটার উঁচু মিনার, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, আরবি ক্যালিগ্রাফি, মোজাইক নকশা এবং বাগানের সমন্বয়ে তৈরি এ স্থাপনা প্যারিসের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবেও পরিচিত।
একশ বছর পরে গ্র্যান্ড মসজিদের মূল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়। সাথে আরবি ভাষা শিক্ষা, ইসলামি শিক্ষা, ধর্মীয় আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শুক্রবারের জুমার নামাজ এবং রমজান ও ঈদের সময় মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
গ্র্যান্ড মসজিদের পরিচালনা ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। ফরাসি সরকার কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ করে না। গ্র্যান্ড মসজিদও সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বর্তমানে এর রেক্তর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেমস এদ্দিন হাফিজ।
আরও পড়ুন: এনসিপির নতুন কমিটিতে ৩ নেতার পদাবনতি, কারণ অজানা
২০২৬ সালে শতবর্ষ উপলক্ষে গ্র্যান্ড মসজিদে নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মধ্যে ঐতিহাসিক প্রদর্শনী, পুরোনো ছবি ও দলিল উপস্থাপন, ইসলামি শিল্প ও সংস্কৃতির আয়োজন এবং আলোচনা সভা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে একশ বছরের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।
শতবর্ষের এ আয়োজনে ফ্রান্সের সরকারি প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, কূটনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ, মন্ত্রী অরোর বেরজে, প্যারিস পুলিশের প্রিফেক্ট পত্রিস ফোর, প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার, ইল দ্য ফ্রঁস অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ভালেরি পেক্রেস ও আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
গ্র্যান্ড মসজিদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি মানবিক অধ্যায়ও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন গবেষণায় জানা গেছে, নাৎসি দখলদারিত্বের সময় তৎকালীন রেক্তর সি কাদ্দুর বেংগাব্রিতের নেতৃত্বে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কিছু নির্যাতিত মানুষকে সহায়তা করেছিলেন। তবে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।
ফরাসি ইতিহাসবিদ বেনজামিন স্তোরা গ্র্যান্ড মসজিদকে ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একশ বছর আগে যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যে মসজিদ নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা ফ্রান্সের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বর্তমানে ফ্রান্সের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে সংরক্ষিত আছে আত্মত্যাগ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সহাবস্থানের একটি দীর্ঘ ইতিহাস।
আরও পড়ুন: ‘বেহেশতের গ্যারান্টি দিতে পারব না, তবে উন্নয়নের গ্যারান্টি দিতে চাই’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন