০৯:৫৪ এম
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়ার জন্য রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সের বাইরে আজ শনিবার (৪ জুলাই) সকালে ভোর থেকেই হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় জনসাধারণের জন্য মোসাল্লা কমপ্লেক্স খুলে দেওয়ার আগে থেকেই শোকাহত মানুষের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়ে যায়। গত শুক্রবার (৩ জুলাই) এই গ্র্যান্ড মোসাল্লাতেই খামেনির জানাজা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অপেক্ষমাণদের একজন সোমাইয়ে হামেদি এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে শেষবার বিদায় জানাতে এসেছি। তাই এভাবে অপেক্ষা করা আমাদের কাছে কষ্টকর বা কঠিন মনে হচ্ছে না।’
আরও পড়ুন: তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই কমিশনারের সাক্ষাৎ
এছাড়া, খামেনির মৃত্যুতে ইরানজুড়ে কয়েকদিন ধরে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে হাজারও মানুষ তেহরানে এসে শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগদান করছেন। ৩৭ বছরের নেতৃত্বের অবসান ঘটেছে, কিন্তু অশ্রু আর স্মৃতিতে এখনও অম্লান আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তেহরান থেকে মাশহাদ, শেষ বিদায়ের প্রতিটি পথ পরিণত হচ্ছে শোক, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের মহাসমুদ্রে।
প্রশাসন আশা করছে, প্রয়াত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা খামেনির জানাজায় এক কোটির বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করবে। ১০০টিরও বেশি বিদেশি প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধা জানালেও ইউরোপীয় দেশগুলোতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি তেহরানের পক্ষ থেকে।
খামেনি ইরানের জনগণের কাছে কেবল একজন নেতা ছিল না, বরং গৌরব, সাহস এবং শক্তির একটি প্রতীক। প্রাণের অভিভাবকের জানাযা ও রাষ্ট্রীয় বিদায়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন হাজারো মানুষ।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা একজন জানিয়েছেন, ‘আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আমাদের হৃদয়ে, আমাদের আত্মায়, আমাদের অস্তিত্বের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তিনি আমাদের সবার সঙ্গে, আমাদের প্রিয় ইরান এবং সমগ্র উম্মাহর সঙ্গে চিরকাল থাকবেন। তাই আমরা কখনোই তাকে বিদায় জানাব না।’
আরও পড়ুন: লিবিয়ায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ, আতঙ্কে প্রবাসীরা
আরেকজন বলেন, ‘আমাদের শহীদ নেতা ছিলেন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান। শহীদ ইমাম ইরান এবং ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে দূরদর্শিতা রেখে গেছেন, তা বিবেচনায় নিয়ে আমরা অবশ্যই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী।’
মর্মান্তিকভাবে জানাতে হয়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হন। একই হামলায় তাঁর মেয়ে, নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও নিহত হন। ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাত চলতে থাকায় খামেনির দাফন অনুষ্ঠান কয়েকবার পিছিয়ে নির্ধারিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির অবকাশে প্রায় চার মাস পর ব্যাপক আয়োজনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুসারে খামেনির স্মরণে সাতদিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ইরান ও ইরাকের একাধিক শহরে অনুষ্ঠিত হবে, যা গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আনা হয় খামেনির মরদেহ। শুক্রবার একটি ঐতিহাসিক ও ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে ইরানের তিনটি সরকারি শাখার প্রধানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি, সংসদীয় স্পিকার, বিশেষ দূত, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদরা শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
আরও পড়ুন: ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপের চার দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই
এরপর একে একে সেখানে হাজির হন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও শীর্ষ নেতারা। তাঁরা নীরবে চোখের জলে দোয়া করেন প্রিয় নেতার জন্য। ইরানি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রতিনিধি, প্রতিরোধ ফ্রন্টের শহীদ পরিবার এবং আরব উপজাতীয় নেতারাও এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
শুধু ইরানের নেতারাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং ইরানের মিত্রদের পরিবারও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন। ভারতের শিখ ও হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধিদলও খামেনির মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহর পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি খামেনির মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং পরে ইরানের প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তবে এবার ইউরোপীয় দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি তেহরানের পক্ষ থেকে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণের প্রশ্নই ওঠে না। ফলে খামেনির শেষ বিদায়ের আয়োজন শোকানুষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান ও মিত্রতারও স্পষ্ট বার্তা হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: মকবুল হত্যা মামলায় সুলতান মনসুর ও মঈনউদ্দিনকে গ্রেপ্তার দেখাল আদালত
শোকযাত্রার প্রতিটি গন্তব্য বহন করছে বিশেষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তাৎপর্য। ক্ষমতার কেন্দ্র তেহরানের পর মরদেহ নিয়ে ময়মনসিংহ শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কোমে, যেখানে অন্তত ২০ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এরপর ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ গন্তব্য হবে মাশহাদ। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের মাজার এবং খামেনির জন্মস্থান হওয়ায় সেখানে আরও প্রায় ৪০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে ইরান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন