০৮:৩১ এম
বিশ্বের দীর্ঘকাল ধরে প্রকাশিত ক্রীড়া গ্রন্থ 'উইজডেন ক্রিকেটার্স’ অ্যালম্যানাক' অন্যতম। ১৮৬৪ সাল থেকে এটি প্রতি বছর প্রকাশিত হয়ে আসছে। যুদ্ধ, মহামারি, সামাজিক অস্থিরতা এমনকি ক্রিকেট বন্ধ থাকার সময়েও এর প্রকাশনা কখনো থেমে যায়নি।
প্রথম সংস্করণটি ছিল ১১২ পৃষ্ঠার, যেখানে মূলত ইংল্যান্ডে গত ৫০ বছরের ম্যাচের স্কোরকার্ড, ক্রুসেডের তারিখ এবং জর্জ ওয়াশিংটনের মৃত্যুর তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের সংস্করণটি ১,৫২০ পৃষ্ঠার, যেখানে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট, নারী ক্রিকেট, বিশদ বিশ্লেষণ এবং বিপুল পরিসংখ্যান স্থান পেয়েছে।
ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে এটি সংকলিত ও প্রকাশিত হলেও বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এর পাঠক ও সংগ্রাহক রয়েছেন। বিরল সংস্করণগুলোর জন্য অনেক সংগ্রাহক বিপুল অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০২৬ ময়মনসিংহে শুরু
কিভাবে শুরু হলো উইজডেন?
সাবেক ক্রিকেটার জন উইজডেন ১৮৬০-এর দশকের শুরুতে এই অ্যালম্যানাক প্রতিষ্ঠা করেন। লন্ডনে তার তামাক ও ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী এক দোকান 'দ্য ইয়ং ক্রিকেটার্স গাইড' নামে একটি প্রকাশনা বের করত। সেই প্রতিযোগিতায় নামতেই উইজডেন নিজের পত্রিকা শুরু করেন।
১৮৬৪ সালের প্রথম সংস্করণের দাম ছিল এক শিলিং। ভূমিকায় উইজডেন লিখেছিলেন, ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে এবং সাফল্য পেলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সংস্করণ প্রকাশ করা হবে।
সেই "মাঝারি সাফল্য" আজ এক বিশাল ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এখন এটি ক্রিকেটের ‘বাইবেল’ হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: শেষ মুহূর্তে তপুর চোট, জামাল ভূঁইয়া দলের নতুন অধিনায়ক
লাখ লাখ টাকার সংগ্রহ
উইজডেনের সব ১৬৩টি মূল সংস্করণের পূর্ণ সেট কিনতে হলে বর্তমানে খরচ পড়বে ৩ লাখ পাউন্ডেরও বেশি (প্রায় ৪ লাখ ডলার)। এটি যুক্তরাজ্যের গড় বাড়ির মূল্যের চেয়েও বেশি।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উইজডেন সংগ্রাহক ও বিক্রেতা বিল ফারমিজ জানান, আসল সংস্করণগুলোর মধ্যে ১৮৭৫ সালের সংস্করণ সবচেয়ে বিরল। মাত্র ২৫০ কপি ছাপা হয়েছিল। পরে পুনর্মুদ্রণের সময় অগ্নিকাণ্ডে অধিকাংশ কপি নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে একটি আসল ১৮৭৫ সংস্করণের মূল্য ৪৫ থেকে ৫০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।
১৮৯৭ সালের হার্ডকভার সংস্করণ দ্বিতীয় বিরলতম। ১৮৯৬ সালে প্রথম হার্ডকভার প্রকাশিত হলেও বিক্রি কম হওয়ায় পরের বছর কমসংখ্যক কপি ছাপা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: চাঁদপুরে শুরু হলো নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২
ইন্টারনেট যুগে টিকে থাকার লড়াই
উইজডেনের বর্তমান সম্পাদক লরেন্স বুথের মতে, ইন্টারনেট আসার পর অ্যালম্যানাককে তার ভূমিকা বদলাতে হয়েছে।
এক সময় মানুষ পরিসংখ্যানের জন্য উইজডেনের উপর নির্ভর করত। কিন্তু এখন অনলাইনে মুহূর্তেই তথ্য হালনাগাদ হয়। তাই উইজডেন ধীরে ধীরে শুধু পরিসংখ্যানের ভাণ্ডার না হয়ে উচ্চমানের ক্রিকেট সাহিত্য ও বিশ্লেষণের বইয়ে পরিণত হয়েছে।
বুথ বলেন, “বইটির প্রথম ৩০০ পৃষ্ঠা আমরা বছরের সেরা ক্রিকেট-লেখায় ভরিয়ে দিতে চাই।”
আরও পড়ুন: 'নতুন এসেছে তো, একটু এক্সাইটেড', বলেন তাসকিন উইন্ডিজ ব্যাটার সম্পর্কে
নারী ক্রিকেটের উত্থান
নারী ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও প্রতিফলিত হয়েছে উইজডেনে। ২০১৮ সালের সংস্করণে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপজয়ী তারকা আনিয়া শ্রাবসোল প্রথম নারী হিসেবে প্রচ্ছদে স্থান পান।
উইজডেনে নারী ক্রিকেটের প্রথম উল্লেখ আসে ১৯৩৮ সালে।
ইতিহাসের সাক্ষী
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের কাছে উড়ে গেল বাংলাদেশ, ১১৩ রানে হার
উইজডেন শুধু ক্রিকেট বই নয়, বরং এক অর্থে সামাজিক ইতিহাসও।
এর পাতায় অসংখ্য চমকপ্রদ গল্প ও তথ্য পাওয়া যায়। যেমন, ভবিষ্যৎ রাজা ষষ্ঠ জর্জ এক ম্যাচে টানা তিন বলে উইকেট (হ্যাটট্রিক) নিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সেই তিন ব্যাটার ছিলেন তার দাদা, বাবা এবং বড় ভাই, যারা পরবর্তীতে একই ক্রমে ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেছিলেন।
আবার ১৯৮৫ সালের সংস্করণে একটি স্কুল ক্রিকেট ম্যাচের স্কোরকার্ডে দেখা যায়, ভবিষ্যৎ ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইন ও মাইক আথারটন ১৬ বছর বয়সে একে অপরকে আউট করেছিলেন। পরে তারা ইংল্যান্ডের হয়ে ৫৭টি টেস্ট খেলেন একসঙ্গে।
যুদ্ধ ও মহামারির ছাপ
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের বড় হারে আফগানিস্তানের কাছে শুরু
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রিকেট কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। এর প্রভাব উইজডেনেও পড়ে। ১৯১৪ সালের সংস্করণ ছিল ৭৯৯ পৃষ্ঠার, যা ১৯১৬ সালে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৯৯ পৃষ্ঠায়।
একইভাবে করোনা মহামারির বছরে প্রকাশিত ২০২১ সংস্করণও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক পাতলা ছিল।
সংগ্রাহকদের আবেগ
অনেকের কাছে উইজডেন শুধু বই নয়, বরং পারিবারিক স্মৃতি। সাংবাদিক পলি স্টার্কি তার দাদার কাছ থেকে ৫০টিরও বেশি সংস্করণ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন।
অন্যদিকে স্পেনে বসবাসকারী স্টিভ গ্রিনের সংগ্রহে রয়েছে ১৮৬৪ সালের প্রথম সংস্করণ থেকে শুরু করে প্রতিটি উইজডেন। তিনি ১৯৬২ সাল থেকে প্রতি বছর নতুন সংস্করণ কিনে আসছেন।
ক্রিকেটের চিরন্তন দলিল
দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে উইজডেন শুধু ক্রিকেটের তথ্য সংরক্ষণ করেনি, বরং ক্রিকেটের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক গল্পও তুলে ধরেছে। সংগ্রাহকদের আগ্রহ, পাঠকদের ভালোবাসা এবং সম্পাদকদের যত্নশীল সংকলনের কারণে ক্রিকেটের এই ‘বাইবেল’ আগামী দিনেও তার মর্যাদা ধরে রাখবে বলেই মনে করা হয়।
আর তাই, ১৬৩ সংস্করণ পেরিয়ে এখন সবাই অপেক্ষা করছে পরবর্তী সংস্করণের।
সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন