০৮:২৩ এম
অন্য যেকোনো বছরে মুহাম্মদ বিন সালমান এই সময়ে নিজেকে মূল আকর্ষণে পরিণত করার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। ২৬ অক্টোবর সৌদি রাজধানী রিয়াদে ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই)’ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই সম্মেলনকে অনেকে ‘মরুভূমির ডাভোস’ বলেও অভিহিত করেন। এই সপ্তাহে ক্রাউন প্রিন্স বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বড় বড় অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং অন্যান্য মহারথীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত থাকতেন। কারণ তারা সবাই সৌদির সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন।
কিন্তু এই বছর পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হুথিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে রিয়াদকে লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। পরপর কিছু প্রাণঘাতী হামলার পর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকেই তাদের নাগরিকদের সৌদি সফর না করতে পরামর্শ দিয়েছে। রিয়াদের হোটেল বা অন্যান্য আয়োজনস্থলে হামলার আশঙ্কায় ব্যবসায়ী ও করপোরেট নির্বাহীরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। বহু চিন্তাভাবনার পর ১৯ অক্টোবর আয়োজকেরা সিদ্ধান্ত নেন—এবারের সম্মেলনটি স্থগিত রেখে আগামী বছর আয়োজন করা হবে।
এক দশক আগে ক্ষমতায় আসার সময় প্রিন্স মুহাম্মদ বড় কিছু বাজি ধরেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন যে তিনি হুথিদের পরাজিত করবেন, সৌদি অর্থনীতিকে আমূল পরিবর্তন করবেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্ভরযোগ্য মিত্র হবেন। কিন্তু বর্তমানে তার এসব বাজি একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে। এফআইআই বাতিলের সিদ্ধান্তটি প্রিন্স মোহাম্মদের দুর্ভাগ্যের বছরের একটি বাহ্যিক প্রতীক। বর্তমানে তিনি একের পর এক জটিল সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন, যেগুলোর কোনোটির সমাধান তার হাতে নেই।
আরও পড়ুন: ইয়েমেন যুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করল ইরান
সৌদি সরকার হুথিদের দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তবে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি দিয়ে তারা আশা করেছিল যে হুমকিটি চেপে রাখা যাবে। কিন্তু এই গ্রীষ্মে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের সর্বব্যাপী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেই যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে শুরু করে। হুথিরা ইয়েমেনে আরও এলাকা দখল করেছে এবং সৌদিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ক্রাউন প্রিন্সের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এখন শুধুমাত্র অশুভ বিকল্প দেখতে পাচ্ছেন। সৌদি সরকারকে হয় নতুন করে পদাতিক সৈন্য পাঠাতে হবে, নয়তো বিমান হামলা চালিয়ে যেতে হবে, অথবা ইয়েমেনে হুথিদের শাসনকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার মতো একটি চুক্তি করতে হবে।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত প্রিন্সের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে দেবে। ২০২৬ সালের আগেই সেই পরিকল্পনায় টান পড়েছিল। সরকারি তহবিলে টান পড়ায় বেশ কিছু বড় প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের বেতন বাড়েনি। বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা প্রিন্স ধরেছিলেন, বাস্তবে আসছে তার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। এক বছর আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ধারণা করেছিল ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতি চার শতাংশ বাড়বে। এখন তারা বলছে, উল্টো ৩.৩ শতাংশ সংকুচিত হবে।
২০২৭ সালে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে কি না, তা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসার ওপর নির্ভর করছে। আর সেই শান্তি ফিরে আসার বিষয়টি অনেকাংশে ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে। রিয়াদ ভেবেছিল, ট্রাম্পের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। আমেরিকায় বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা ট্রাম্পকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিল। তাছাড়া, ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিও করা হয়েছিল। সৌদির অর্থায়নে আয়োজিত টুর্নামেন্টগুলোর জন্য ট্রাম্পের গলফ কোর্স ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠানে দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও ট্রাম্পকে মহাবিপর্যয়ের যুদ্ধে জড়ানো থেকে আটকানো যায়নি। রিয়াদের রাজনীতি বোঝেন এমন একজন সৌদি ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন, ‘তিনি তো বেশি দিন কারো প্রতি অনুগত থাকেন না।’
সৌদি আরবে নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ চালানোর কোনো উপায় নেই। তবে এটি নিশ্চিত যে বেশিরভাগ সৌদি নাগরিক তাদের সরকারকে ভরসা করেন। তবুও বিগত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাগুলো অনেকের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করেছে। ইয়েমেন যুদ্ধ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করেছে। অথচ ১০ অক্টোবরের পর থেকে প্রিন্স সালমানকে একপ্রকার দেখা যাচ্ছে না। সেদিন রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের মিসাইল হামলায় ১৩ জন নিহত হন। এরপর ভুক্তভোগীদের সান্ত্বনা দেওয়া এবং জনগণকে আশ্বস্ত করার কাজটি মন্ত্রীদের কাঁধে এসে পড়েছিল।
আরও পড়ুন: মস্কোয় পুতিন ও ইরানের নিরাপত্তা প্রধানের বৈঠক
পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, পরপর সংকটে আচ্ছন্ন একটি বছর কি ক্রাউন প্রিন্সের ক্ষমতার ভিত্তিটাই কাঁপিয়ে দিয়েছে? তবে রিয়াদের কূটনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের আশঙ্কা কিছুটা বাড়াবাড়ি। একজন পশ্চিমা দূত বলছিলেন, ‘সাত বা আট বছর আগে তিনি এর চেয়েও কঠিন সময় পার করেছেন।’
সেই সময়ে প্রিন্স সালমান ছিলেন নতুন ক্রাউন প্রিন্স। তখনো তিনি নিজের ক্ষমতা শক্তিশালীভাবে গুছিয়ে নিতে পারেননি। ইয়েমেন যুদ্ধ তখন এক চোরাবালিতে পরিণত হয়েছিল, কাতার অবরোধ নিয়ে আমেরিকা ক্ষুব্ধ ছিল এবং ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতর সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করার পর বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছিল। সেই তুলনায় আজকের দিনে মোহাম্মদের ক্ষমতার দখল অনেক বেশি নিরাপদ। তিনি তার সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের পর ক্ষমতাকে যেভাবে এককেন্দ্রমুখী করেছেন, তেমনটি আর কেউ করতে পারেনি। তার সমালোচক নিশ্চয়ই আছেন। কিন্তু হঠাৎ অভ্যুত্থান ঘটানোর শক্তি কারো নেই।
এমনিতেই মিত্রদের পক্ষ থেকে তিনি খুব একটা কড়া সমালোচনার মুখে পড়ছেন না। ইয়েমেনে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর মিত্রদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই তা বোঝা যায়। যারা আগে এই যুদ্ধের কঠোর সমালোচক ছিলেন, তারাও এখন মেনে নিচ্ছেন যে সৌদির সামনে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি এই মাসেই রিয়াদে গিয়ে ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি ২০১৮ বা ২০২০ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের সময়টা মিলবে না। হুথিরা যেভাবে এগিয়ে আসছে এবং রকেট হামলা চালাচ্ছে, সৌদিকে সেটি সামলাতেই হবে। আমাদের এই বাস্তবতা স্বীকার করা উচিত।’
তবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রিন্স মোহাম্মদের জন্য এটি আগের চেয়ে বড় পরীক্ষার সময়। কারণ তার প্রথম জীবনের সমস্যাগুলো ছিল তার নিজেরই তৈরি। ফলে সেগুলো সামলে নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল। ২০২১ সালের মধ্যেই তিনি সৌদি পররাষ্ট্রনীতিকে একটি বাস্তববাদী মোড় দিতে পেরেছিলেন। তিনি কাতারের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেন এবং হুথিদের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করেন। এমনকি বাইডেন প্রশাসনও, যারা ক্ষমতায় আসার সময় প্রিন্সকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করার শপথ নিয়েছিল, তাদেরও অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার নতুন নীতির প্রশংসা করতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্ক টাইমস: ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল
সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের আরো প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।
চলতি বছরের সমীকরণটা ভিন্ন। কারণ সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি এখন আর প্রিন্স মোহাম্মদের হাতে নেই। তিনি ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ না বাড়াতে। কিন্তু আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প যদি তার কথা না শুনে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করেন, তবে পরিস্থিতি জটিল হবে। সৌদি কর্মকর্তারা ভয় পাচ্ছেন, তখন সব দিক থেকে আঘাত এসে পড়বে তাদের ওপর। দক্ষিণে হুথি, উত্তরে ইরাকি মিলিশিয়া এবং পূর্বে খোদ ইরান। সৌদিকে রক্ষা করার জন্য তাদের বিশাল একটি ভূখণ্ড রয়েছে, যা আয়তনে ফ্রান্সের চেয়ে চারগুণ বড়। অথচ তা পাহারার জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অভাব।
নিজের শাসনকালের প্রথম দশকে ক্রাউন প্রিন্স সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে কিছু প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। দেশের নারীরা এখন গাড়ি চালাতে পারছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যে দেশে একসময় ‘বিনোদন’ শব্দটাই নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে এখন সিনেমা হল এবং কনসার্ট খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। অল্প কিছু উচ্চবিত্ত বিদেশি এমনকি বৈধভাবে মদ খাওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও সৌদি রাষ্ট্রের মূল চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। দেশের অর্থনীতি এখনো তেলের ওপরই নির্ভরশীল। তাদের সেনাবাহিনী এখনো রাজত্ব সামলানোর জন্য তৈরি, পুরোদস্তুর যুদ্ধ লড়ার জন্য নয়। আর তাদের পররাষ্ট্রনীতি এখনো সেই আমেরিকার প্রতিরক্ষার ওপরই ভরসা করে বসে আছে।
হয়তো কোনো এক দিন এই বিষয়গুলোতেও বড় বদল আসবে। পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি বা তুরস্কের সঙ্গে মক্কা চুক্তি হলো নতুন কিছু মিত্র খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা, যাতে অনির্ভরযোগ্য আমেরিকাকে ছাড়াই কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে এই পরিবর্তনগুলো ঘটতে দীর্ঘ সময় লাগবে। ক্ষমতায় নিজের দ্বিতীয় দশকে এসে সৌদি শাসকের আসল পরীক্ষা হবে ব্যবস্থার ওপরের প্রলেপ বা পলিশ বদলানো নয়, বরং পুরো কাঠামোটাই বদলে ফেলা।
আরও পড়ুন: চিনা স্যাটেলাইটে ধরা পড়লো ইরান ঘিরে ৩ মার্কিন রণতরী
দ্য ইকোনমিস্ট থেকে ভাষান্তর জুলফিকার হায়দার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন