১০:৩৮ পি.এম
দেশব্যাপী বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সংকটের আলোচনা যখন চরমে, তখন বগুড়ার শেরপুরের পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর (আরডিএ) ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি সফলতার খবর দিচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা এবং প্রতি ইউনিটের খরচ মাত্র দেড় টাকা বলে জানা গেছে। দীর্ঘ গবেষণার পর আরডিএ দাবি করেছে, তারা পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের একটি গবেষক দল ২০১৪ সাল থেকে এই গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম। দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আরডিএর মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামাণিক এবং পরিচালক মো. ফেরদৌস হোসেন খান। বগুড়ার সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের বানদীঘী গ্রামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বিগ চিক ইনকিউবেটর অ্যান্ড এগ্রো. ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর স্বত্বাধিকারী মতিয়ার রহমান সরকার ও মিজানুর রহমানও দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। তাদের ১২ বছরের গবেষণার ফলস্বরূপ ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু-সংকটাপন্ন অঞ্চলে টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহে সাশ্রয়ী ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। আলোচিত গবেষণার শুরু, কৃতিত্ব ও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মতিয়ার রহমান সরকার ও মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, এই উদ্ভাবনের সাথে আরডিএর কোন সম্পর্ক নেই। তারা জানিয়েছেন, গবেষণার ফলস্বরূপ আলোচিত প্রযুক্তির কাজটি বহু আগে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। তাদের আরডিএর সাথে কোনো লিখিত চুক্তিও নেই।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
মতিয়ার রহমান সরকার বলেন, পোলট্রি ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার সময় তিনি নিজেই ইনকিউবেটর তৈরি করেন। বড় আকারের ইনকিউবেটরে হাজার হাজার ডিম একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থায় অল্প শক্তিতে ঘুরতে দেখে তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল যে, বড় ভরকে তুলনামূলক কম শক্তিতে ঘোরানো বা গতিশক্তি সঞ্চয় করে পরে অন্য কাজে ব্যবহার করা যায় কি না। এরপর ২০০৪ সালে তিনি ফ্লাইহুইলের একটি ছোট প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ শুরু করেন। পরে মিজানুর রহমান এ কাজে যুক্ত হন। মিজানুর রহমান বিদ্যুৎ কৌশলে ডিপ্লোমাধারী এবং মোটর ও জেনারেটর তৈরির কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় গবেষণাটি ধীরে ধীরে এগোতে থাকে।
আরডিএর সাথে যৌথ গবেষণার বিষয়ে মতিয়ার রহমান বলেন, মনির সাহেবের সাথে পরিচয় হলেও ফ্লাইহুইল নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। তিনি জানান, এই বছরের মে মাসের ১৮ তারিখে তিনি তার অফিসে গিয়ে ফ্লাইহুইল গবেষণায় সরকারি সহায়তার জন্য প্রফাইল তৈরি করে দিতে বলেন। এরপর আরডিএর কর্মকর্তারা কয়েকবার তাদের গবেষণাগার পরিদর্শন করেন। প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং বড় পরিসরে একটি প্রকল্প নেওয়ার কথাও ওঠে। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, গবেষণার কারিগরি উন্নয়ন বা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আরডিএ এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক সহায়তা দেয়নি। বর্তমানে বড় পরিসরে প্রযুক্তিটির পরীক্ষা ও ১ মেগাওয়াটের একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের সরকারি অর্থায়নের জন্য আরডিএ চেষ্টা করছে। উদ্ভাবনের কাজে সম্পৃক্ততার বিষয়ে মিজানুর রহমানও একই কথা বলেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ২২ বছর ধরে তারা এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এতে প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, এখন আরডিএর কৃতিত্ব দাবি করা দুঃখজনক।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান বলেন, মতিয়ার ও মিজান ২০০৪ সাল থেকে গবেষণার কাজ করে আসছেন। এর আগে তিনি কম খরচে মুরগির ইনকিউবেটর তৈরি করেছেন এবং দই তৈরির একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। পরবর্তীকালে অল্প খরচে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা নিজেদের সময়, শ্রম, অর্থ এবং ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যয় করে বছরের পর বছর গবেষণা চালিয়ে গেছেন। যতদূর তিনি জানেন, এই গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি কোনো আর্থিক সহযোগিতা ছিল না। পরবর্তীকালে প্রকল্পটিকে কারিগরি ও বাণিজ্যিকভাবে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির সহযোগিতা চেয়েছেন।
এদিকে, আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০১৪ সাল থেকে তারা যৌথ উদ্যোগে গবেষণা পরিচালনা করছেন। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো লিখিত চুক্তি নেই। গবেষণা পরিচালনা, অর্থায়ন কিংবা প্রযুক্তির মালিকানা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দলিলও করা হয়নি। তারা মতিয়ার ও মিজানুরকে মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাই তাদের কাছে গবেষণার কোন নথি নেই। এখন যেহেতু তাদের গবেষণা সফল হয়েছে, তারা গবেষণাপত্র তৈরির কাজ করছেন।
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
উভয় পক্ষই তাদের গবেষণাকে সফল বলে দাবি করেছেন। গবেষকদের দেওয়া কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরীক্ষামূলক ব্যবস্থায় ৫২ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি প্রাইম মুভার দিয়ে ৬০০ ও ১ হাজার কেজি ওজনের দুটি ফ্লাইহুইল প্রায় ১ হাজার ৪০০ আরপিএম গতিতে ঘোরানোর কথা বলা হয়েছে। এরপর গিয়ারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গতি কমিয়ে প্রায় ২৫০ আরপিএমে আনা হয়। এই যান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে একটি ২৪-পোল স্থায়ী চুম্বক জেনারেটর যুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দাবি করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষায় প্রায় ৬০০ ভোল্ট ও ৫০ হার্জ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে এবং ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে ৪০০ ভোল্টে রূপান্তর করে প্রায় ১১৯ কিলোওয়াট বাস্তব লোড সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৫২ কিলোওয়াট ইনপুট দিয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা যাবে।
গত ১৬ আগস্ট বগুড়ার এরুলিয়ার বানদিঘী এলাকায় পরীক্ষামূলক প্ল্যান্টে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়। সেখানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দুটি পাম্প ও একটি ওয়েল্ডিং মেশিন চালিয়ে দেখানো হয়। এরপরই বিষয়টি ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমের আলোচনায় আসে। দাবি করা হয়, তাদের এই প্ল্যান্টের মাধ্যমে মাত্র দেড় টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
কথিত গবেষণার সাফল্যের বিষয়ে আরডিএর উপপরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম জানান, তাদের এই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তি পদার্থ বিজ্ঞানের স্বীকৃত শক্তির নিত্যতা সূত্রের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও তারা বাস্তবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। চীন, আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড, জাপান সহ পৃথিবীর অনেক দেশ এই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তাদের জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
গবেষক দলের আরেক সদস্য আরডিএর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আব্দুল মজিদ বলেন, ১২ বছর ধরে চলা এই গবেষণায় সরকারের কোন অর্থ ব্যয় হয়নি। দুই উদ্যোগক্তা ব্যক্তিগতভাবে খরচ করেছেন। আমাদের গবেষক দল তাদেরকে সার্বিক সহযোগীতা করেছে। আমরা স্বল্পব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছি। তবে কোন কোন মিডিয়া ভুলভাবে জ্বালানী ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছে। বিষয়টা তেমন নয়। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন হলে দেশের জ্বালানী খাতে আমরা অবদান রাখতে পারব।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও -১ আসনে উপনির্বাচন সরকারি দলকে সমর্থন, গভীর রাতে প্রত্যাহার হলেন ৯ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারসিম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, “যেকোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থায় মোট আউটপুট শক্তি কখনো মোট ইনপুট শক্তির চেয়ে বেশি হতে পারে না-কোথাওই নয়। তাই এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে হলে ইনপুট ও আউটপুট উভয় দিকের ভোল্টেজ, কারেন্ট, পাওয়ার এবং সময় হিসাব করে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা ও পরিমাপ করা প্রয়োজন। আর উদ্যোক্তারা যদি মনে করেন যে প্রযুক্তিটি বাস্তবেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ সাশ্রয় করছে, তাহলে প্রথমে গ্রামপর্যায়ে ছোট পরিসরে এটি প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে। কমিউনিটি পর্যায়ে বাস্তব ব্যবহারে এর অর্থনৈতিক ও কারিগরি সুবিধা প্রমাণিত হলে পর্যায়ক্রমে বড় পরিসরে বা স্কেল আপ করা সম্ভব। শুরুতেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রয়োজন কেন-সেই প্রশ্নেরও একটি বাস্তবসম্মত উত্তর থাকা দরকার।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন