০৯:৫৩ পি.এম
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতা দ্বারা সংঘটিত রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের পুণ্যভূমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) রাজনীতি ও প্রশাসন এক নতুন ও রহস্যময় মোড় নিয়েছে। এখানে পতিত স্বৈরাচারের দোসর এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রকাশ্য ও গোপনে বিরোধিতা করা চরম আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা শুধু যে আত্মগোপনে আছেন তা নয়; বরং তাদের একটি বড় অংশ বর্তমান প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়ে ক্যাম্পাসে পুনর্বাসিত হচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কেউ রয়েছেন দায়িত্বে, আবার কেউ গোপনে আড়ালে রয়েছেন।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ, জাতীয় গণমাধ্যম এবং নির্ভরযোগ্য গোপন তথ্যানুযায়ী বেরোবির বিতর্কিত ও তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থানের সর্বশেষ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো। শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেরোবির চরম আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘নীল দল’-এর দুই বারের সাবেক সভাপতি ড. নিতাই কুমার ঘোষকে কলা অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বর্তমানে প্রশাসন। আরও উল্লেখযোগ্য হল, ঐ সময়ে পরিবহন পরিচালকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি এখন হল প্রভোস্ট হিসেবে কাজ করছেন।
২৪ সালের চরম উত্তাল সময় প্রশাসনের সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা করেছেন ঐ সময়ের পুরো প্রক্টরিয়াল বডি। যার মধ্যে প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বাকি সহকারী প্রক্টররা ৫ আগস্টের পর পরেই আবার প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় তৎকালীন প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করা সহকারী প্রক্টর মো. ইসমাইল হোসেন (সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ) পটপরিবর্তনের পরেও সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শোনা যায়, বর্তমান উপাচার্যের (ভিসি) সরাসরি সাবেক ছাত্র হওয়ার সুবাদে এই সুবিধা তিনি পেয়েছেন বলে অনেকে মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন: ফুটপাত পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ, ছাত্রলীগ নেতা তানভীর গ্রেফতার
এছাড়া জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্রদের চরম বিপদে পাশে না দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারের পক্ষে দালালি করা তৎকালীন ছাত্র উপদেষ্টা, নীল দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ারুল আজিম ৫ আগস্টের পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেও বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ 'ধরাছোঁয়ার বাইরে' চলে গেছেন। সেই সাথে তৎকালীন বহিরাঙ্গন পরিচালক এবং শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের ঘনিষ্ঠ সাব্বীর আহমেদ চৌধুরীও রয়েছেন ধরাছোয়ার বাহিরে। যিনি জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে নিজেকে বাঁচাতে এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করে ক্যাম্পাস থেকে গা-ঢাকা দেন। এমফিল করতে ঢাকায় অবস্থান করেন ১ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর শাখা ছাত্রদল তাঁকে দৌড়ানি দেয় বলেও শোনা গেছে।
হাসিনাকে ফেরানোর গোপন তৎপরতায় জড়িত থাকার কারণে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় নাম আসায় চরম আওয়ামীপন্থী শিক্ষক আসাদ মন্ডল ও ড. মশিউর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে, এবং তারা দুজনেই পলাতক রয়েছেন। এছাড়া ঐ সময়ে বিভিন্ন দায়িত্ব প্রাপ্ত নীল ও হলুদ দলের কিছু শিক্ষক এখনও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
এই বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাফায়েল ইমতিয়াজ ইয়ামিন বলেন, "আমরা এই বিষয়ে অবগত আছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি ফ্যাসিস্ট শিক্ষামন্ত্রী এর শিক্ষক ইতোমধ্যে প্রশাসনের কাছে গেছিলো, আমরা তখন প্রতিবাদ করেছি। আমরা ছাত্রদল সবসময় ফ্যাসিস্টের দোসর যারা বিশ্ববিদ্যালয় সঠিকভাবে পরিচালনা করতে দিচ্ছে না তাদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য প্রশাসনকে বলেছি। আমরা দেখবো প্রশাসন কতটুকু ব্যবস্থা নেয়। প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবো। পাশাপাশি যারা সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে চাকরি পেয়েছে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং চাকরিচ্যুত করতে হবে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা শিবিরের নেতা শিবলী সাদিক বলেন, "জুলাই বিপ্লবের আজ দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক বিষয় হলো, শহীদ আবু সাইদের ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে এখনো ফ্যাসিস্টের দোসর শিক্ষকরা খোলস পাল্টে নানাভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আবু সাইদ বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার জন্য জীবন দিলেও তার বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়নি, এটি সত্যিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এরই মধ্যে আমরা বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের সূত্রে জানতে পেরেছি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষক স্বৈরাচার হাসিনাকে পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নামমাত্র তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়নি।"
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে সাত, হাসপাতালে ভর্তি ১,৩৭৩ জন
তিনি আরও বলেন, "এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি—দ্রুত ফ্যাসিস্টের দোসর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে তারা যদি কোনো প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, সেসব পদ থেকেও তাদের অব্যাহতি দিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।"
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনে ৫৫টি পদ আছে। আমাদের তো ৫৫ জন শিক্ষক দরকার, কাওকে না কাওকে তো দায়িত্ব দিতে হবে। অনেকেই জাতীয়তাবাদী ফোরামের শর্ত পূরণ করেছেন, এটা তাদের গনতান্ত্রিক অধিকার। সারাজীবন কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করবে এমন তো নয়। অনেক বড় বড় নেতারা তাদের রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে এখন বিএনপি করেন। আমাদের সবাইকে নিয়েই চলতে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় তো বন্ধ রাখা যাবে না।"
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন