০৭:৩৮ পি.এম
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সম্মত হয়। এই চুক্তিগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং যৌথ সহযোগিতার বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত দুই দশকের মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক বাণিজ্য ও অভিবাসনের সীমা ছাড়িয়ে প্রতিরক্ষা খাতে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। নিয়মিত সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি অনিশ্চয়তা দুই দেশকে আরো কাছাকাছি এনেছে। যোগাযোগ ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও যৌথ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, সামুদ্রিক নজরদারি এবং সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: যুদ্ধে ও নির্বাচনে হেরেছেন ট্রাম্প, আরও পরাজয় উপহার দেবে ইরান: বিচার বিভাগীয় প্রধান
কৌশলগত প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিকভাবে, চারটি কারণে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। প্রথমত, স্নায়ুযুদ্ধের সময় অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মিত্র ছিল, যেখানে ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করলেও ১৯৭১ সালের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সময় অস্ট্রেলিয়া ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক স্থাপন করে।
দ্বিতীয়ত, ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যা অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
তৃতীয়ত, দীর্ঘকাল ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত ছিল।
আরও পড়ুন: যেভাবে রাশিয়ার যুদ্ধ ফাঁদে দিশেহারা বাংলাদেশি শ্রমিকরা
চতুর্থত, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগের অভাব ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ‘হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া’ নীতি এই দূরত্বকে আরো বাড়িয়ে দেয়। তবে ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের ভারত সফরের পর সম্পর্ক উন্নতির সূচনা ঘটে। ওই বছর প্রতিরক্ষা আলোচনা শুরু হয় এবং ২০০১ সালে প্রথম কৌশলগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৪ সালে সুনামির পর ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে মানবিক সহায়তা প্রদান করে। ২০০৬ সালে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০০৭ সালে প্রথম কোয়াড সংলাপ এবং মালাবার নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। তবে ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া কোয়াড থেকে সরে যায় এবং একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার কারণে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কঠোর অবস্থান, সাইবার হামলা এবং ২০১৭ সালে ডোকলাম সীমান্তে ভারত-চীন উত্তেজনা এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২০০৯ সালে দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে প্রথম যৌথ ঘোষণা দেয়। ২০১১ সালে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হয়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়। এরপর যৌথ সামরিক মহড়া শুরু হয়। ২০১৭ সালে কোয়াড পুনরায় সক্রিয় হয় এবং ২০১৮ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ও কসোভোর মধ্যে অভিন্ন স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
২০১৯ সালের পর চীনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পায়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বিরোধ ও সাইবার হামলার ঘটনা এবং ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘাত দুই দেশের সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠ করে। ওই সংঘাতে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। এরপর ভারত চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়। অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অকাস চুক্তি করে। অন্যদিকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ায়। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা নীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় দুই দেশ বিকল্প অংশীদারির দিকে নজর দিচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ ভারত মহাসাগরের দুই প্রান্তে অবস্থিত। তাদের বাণিজ্যের জন্য হরমুজ, মালাক্কাসসহ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখা অপরিহার্য। যৌথভাবে সমুদ্র নিরাপত্তা বৃদ্ধি করলে দুই দেশ নিজেদের উপকূল ও বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে।
২০২০ সালের পর ভারত-অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত সহযোগিতা
আরও পড়ুন: ঝাড়খণ্ডের থানার ভেতরে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ পুলিশ বরখাস্ত
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি ও স্কট মরিসন পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সহযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০২০ সালে দুই দেশ ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারি’ গড়ে তোলে। পাশাপাশি সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একাধিক চুক্তি সম্পন্ন হয়।
২০২১ সালে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠক করেন। এ সময় ভারত অস্ট্রেলিয়ার ‘তালিসমান সাবর’ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও মহাকাশ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
২০২৪ সালে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। একই বছর আকাশে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশ সমঝোতা করে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় নিয়মিত প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর যৌথ মহড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারত ও অস্ট্রেলিয়া ১৪টি দ্বিপক্ষীয় এবং ৬৪টি ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করে।
২০২১ সালে দুই দেশের নৌবাহিনী পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি যৌথ নির্দেশিকা স্বাক্ষর করে। তাদের যৌথ নৌ-মহড়া ‘অসইন্ডেক্স’-এ সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ ও যুদ্ধবিমান ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। অন্যদিকে স্থলবাহিনীর ‘অস্ত্রাহিন্দ’ মহড়ায় ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধের কৌশলে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের মহড়ায় উভচর যুদ্ধ ও উপকূলীয় এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে রানওয়েতে আটকে গেল এমিরেটসের এ-৩৮০
যৌথ উৎপাদন ও সামরিক সহযোগিতার পথে বাধা
ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও কিছু সমস্যা এখনও বিদ্যমান। এর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার অভাব, সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণে জটিলতা এবং দ্রুত ভিসা পাওয়ার সমস্যা অন্তর্ভুক্ত।
অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ভারত-অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপক্ষীয় সামরিক কার্যক্রমে অনেক সময় যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানে সমস্যা দেখা দেয়। আবার যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নীতির কারণে সামরিক বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও মেরামতের কাজও জটিল হয়ে পড়ে।
এছাড়া সামরিক মহড়া, বন্দর পরিদর্শন ও অন্যান্য কার্যক্রমে অংশ নিতে দুই দেশের সেনাসদস্যদের দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুযোগও সীমিত। এসব সমস্যা সমাধান না হলে যৌথ সামরিক অভিযান ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের রেকর্ড সাফল্য
ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের উদ্বেগ প্রায় একই। এই সহযোগিতা জোরদার করতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি যৌথভাবে উৎপাদন, সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, পি-৮ নজরদারি বিমানের পারস্পরিক ব্যবহার এবং নৌযান ও সাবমেরিন মেরামতে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা, সাঁজোয়া যান ও চালকবিহীন ডুবোযান তৈরিতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন