শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
১০:৩৯ এম
ইরানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করার কাজ বহু বছর ধরে চলছে। দেশটির সরকার ‘জানফাদা’ নামে পরিচিত একটি প্রচারাভিযানের আওতায় কিশোরদের সামরিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তেহরানের বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে শিশু-কিশোরদের অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণের ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
এই উদ্যোগের পেছনে ইরানের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা-ভাবনা এবং শিশুদের সামরিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার ঝুঁকি—এই তিনটি বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা ও জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা একটি রাষ্ট্রের নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। সেই প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনে শিশু-কিশোরদের যুক্ত করা হচ্ছে, তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে—সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
‘জানফাদা’ প্রচারাভিযান
‘জানফাদা’ শব্দটির অর্থ আত্মত্যাগ বা আত্মনিবেদন। ইরানের এই প্রচারাভিযানের স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, ‘আমাদের জীবন একটাই, আর তা আমরা ইরানের জন্য উৎসর্গ করি।’ প্রচারাভিযানটির মুখপাত্র সাসান জারে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জানান, কম বয়সীদের জন্যও বয়সোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ, প্রাথমিক চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং আত্মত্যাগের সংস্কৃতির ওপর জোর দেওয়ার কথা।
তবে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলেদের লক্ষ্য করে প্রচারাভিযানটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ড্রোন পরিচালনা, নজরদারি, স্থানীয় নিরাপত্তা এবং অস্ত্রসংক্রান্ত প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। দুর্যোগে সহায়তা, প্রাথমিক চিকিৎসা, নাগরিক দায়িত্ব ও জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আচরণ শেখানো এক ধরনের প্রস্তুতি। অন্যদিকে অস্ত্র পরিচালনা, সামরিক নজরদারি, গোয়েন্দা কার্যক্রম কিংবা নিরাপত্তা চৌকিতে দায়িত্ব পালনের জন্য শিশুদের প্রস্তুত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি শিশুদের জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা বাড়াতে পারে; দ্বিতীয়টি তাদের সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে যেতে পারে।
তেহরানের জনপরিসরে অস্ত্র প্রশিক্ষণের ছবি
তেহরানের আজাদি স্কয়ার ও হাফতে তির স্কয়ারে শিশু-কিশোরদের সামরিক প্রশিক্ষণের ছবি ও বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। ৪ অক্টোবর হাফতে তির স্কয়ারে সামরিক পোশাক পরা কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে শিশুদের আগ্নেয়াস্ত্র পরিচালনা, লক্ষ্য স্থির করা এবং অস্ত্রের বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর আজাদি স্কয়ারেও শিশুদের সামরিক ধাঁচের পোশাকে অস্ত্র তাক করার অনুশীলনের ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। ইরান ইন্টারন্যাশনাল-এর ২০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনেও শিশুদের অস্ত্র হাতে জানফাদা-সংশ্লিষ্ট সমাবেশে অংশ নেওয়ার ছবি প্রকাশিত হয়। ফলে শিশুদের এই প্রচারাভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দেখা গেছে।
জনসমাগমস্থলে এমন প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে শিশুদের কাছে কী বার্তা পৌঁছাচ্ছে? জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নাগরিকের ভূমিকা বোঝানো এক বিষয়; কিন্তু শৈশবেই অস্ত্র, যুদ্ধ ও আত্মোৎসর্গকে স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা আরেক বিষয়। শিশুরা যখন এসব দৃশ্য দেখে বড় হয়, তখন তাদের কাছে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সামরিক আনুগত্যের সীমারেখা কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
১২ বছর বয়স থেকে নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের প্রশ্ন
শিশুদের সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করা ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই শুরু হয়নি। ৩০ মার্চ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ১২ বছর বয়সী শিশুদেরও ‘স্বদেশরক্ষী যোদ্ধা’ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের প্রচার চালিয়েছে। এই কর্মসূচিতে খাবার বিতরণ, চিকিৎসাসহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর নিয়ে সহায়তার মতো কাজের পাশাপাশি নিরাপত্তা চৌকি, টহল এবং গোয়েন্দাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ২ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১২ বছর বয়সী শিশুদের সামরিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নিয়োগের ব্যাপারটি তুলে ধরে। সংস্থাটি জানায়, তাদের যাচাই করা ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা চৌকি ও টহলে অংশ নেওয়ার প্রমাণ রয়েছে; কিছু শিশুর হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা গেছে।
অন্যদিকে জানফাদা প্রচারাভিযানের মুখপাত্র জারে দাবি করেছেন, মূল স্বেচ্ছাসেবী কাঠামোতে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং কম বয়সীদের জন্য প্রশিক্ষণের ধরন আলাদা। তার বক্তব্যে শিশুদের চৌকিতে ব্যবহারের বিষয়ে দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থার ওপর বর্তানোর কথাও উঠে এসেছে। এই বক্তব্যগুলো দেখায়, প্রচারাভিযানের ঘোষিত উদ্দেশ্য, প্রশিক্ষণের বাস্তব ধরন এবং মাঠপর্যায়ে শিশুদের ব্যবহার—এই তিনটি বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শিশুদের অংশগ্রহণ কতটা স্বেচ্ছামূলক, অভিভাবকদের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হচ্ছে এবং তারা কার্যক্রমের প্রকৃতি ও ঝুঁকি সম্পর্কে কতটা অবহিত। রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা কিংবা পরিবারের ওপর প্রভাব কোনো শিশুর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শুধু ‘স্বেচ্ছাসেবী’ শব্দ ব্যবহার করলেই শিশুদের অংশগ্রহণ নিরাপদ বা অধিকারসম্মত হয়ে যায় না।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের ঐতিহাসিক ছায়া
ইরানে শিশু-কিশোরদের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার বিতর্কের পেছনে রয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০–১৯৮৮) ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। ওই যুদ্ধে ইরানের বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী কাঠামোর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও কিশোরকে যুদ্ধসংক্রান্ত কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছিল। অতীতের সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমানের শিশু-কিশোর সামরিক প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা টানা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যুদ্ধের স্মৃতি, আত্মত্যাগ, শহীদত্ব ও জাতীয় প্রতিরক্ষার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এই স্মৃতি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ভাবনা এবং নাগরিকদের দেশরক্ষার আহ্বানে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ শুধু ত্যাগের কাহিনি পুনরাবৃত্তি নয়; যুদ্ধের মানবিক মূল্য, পরিবারগুলোর ক্ষতি, শিশুদের মানসিক আঘাত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংঘাতের বাইরে রাখার প্রয়োজনীয়তাও অনুধাবন করা। একটি রাষ্ট্র তার ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় সংরক্ষণ করতে পারে শিক্ষা, ইতিহাসচর্চা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমেও।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলোকে ১৫ বছরের কম বয়সীদের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ঠেকাতে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এই বয়সসীমার নিচে কাউকে সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও সনদে রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে। ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ বা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে নিষিদ্ধ; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। অন্যদিকে ১৮ বছরের কম বয়সীদের সামরিক কাজে সম্পৃক্ততার সব ধরনকে একই আইনি শ্রেণিতে ফেলা যায় না—কাজের প্রকৃতি, নিয়োগের ধরন, সশস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক চুক্তির বিধান বিবেচনা করতে হয়।
সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের সম্পৃক্ততা নিয়ে শিশু অধিকার সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত সুরক্ষা নির্ধারণ করেছে। জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক দপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই প্রটোকলের লক্ষ্য ১৮ বছরের কম বয়সীদের যুদ্ধে নিয়োগ ও ব্যবহার প্রতিরোধ করা এবং সংঘাতে যুক্ত হয়ে পড়া শিশুদের মুক্তি, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনঃএকীভূতকরণ নিশ্চিত করা।
ইরান শিশু অধিকার সনদের সদস্যরাষ্ট্র হলেও সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের সম্পৃক্ততা-সংক্রান্ত ঐচ্ছিক প্রটোকল স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৬ সালের এপ্রিলের বিবরণ অনুযায়ী সেটি অনুসমর্থন করেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুদের সামরিক ব্যবহারের বিষয়ে দেশটির কোনো আন্তর্জাতিক আইনি দায় নেই। শিশু অধিকার সনদ এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শৈশব, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সমাজ
সামরিক প্রশিক্ষণের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক শারীরিক বিপদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অস্ত্র বহন, নিরাপত্তা চৌকিতে অবস্থান কিংবা সংঘাতের আশঙ্কাপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনের ফলে শিশুদের জীবনহানি, আঘাত, মানসিক চাপ এবং সহিংসতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক দপ্তর বলেছে, সশস্ত্র গোষ্ঠী বা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত শিশুরা যোদ্ধা ছাড়াও রাঁধুনি, বার্তাবাহক, গুপ্তচর কিংবা সহায়ক ভূমিকায় ব্যবহৃত হতে পারে; এসব ভূমিকাও তাদের বিপদ ও নির্যাতনের মুখে ফেলতে পারে।
এ কারণে শিশুর হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। সামরিক নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ, টহল, চৌকিতে দায়িত্ব পালন কিংবা সশস্ত্র বাহিনীর সহায়ক কাজেও শিশুদের যুক্ত করা হলে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষত সংঘাত চলাকালে সামরিক স্থাপনা ও নিরাপত্তা চৌকি হামলার লক্ষ্যবস্তু হলে সেখানে উপস্থিত অপ্রাপ্তবয়স্করা অতিরিক্ত ঝুঁকিতে পড়ে।
শিশুদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ধারণা কীভাবে শেখানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে ভালোবাসা, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আইন মানা, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করা—এসব মূল্যবোধ শিশুর বিকাশের ইতিবাচক অংশ হতে পারে। কিন্তু দেশপ্রেমের সঙ্গে যদি অল্প বয়সেই অস্ত্র, শত্রু-ভাবনা এবং আত্মবিসর্জনের ধারণা এমনভাবে যুক্ত করা হয় যে শিশুর কাছে জীবন বিপন্ন করাই নাগরিক দায়িত্বের প্রধান প্রকাশ হয়ে ওঠে, তবে তা নিয়ে গুরুতর শিক্ষাগত ও নৈতিক প্রশ্ন দেখা দেয়।
শিশুদের মানসিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রতিটি শিশু একই ধরনের মানসিক ক্ষতির শিকার হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তাদের নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করাই দায়িত্বশীল নীতির ভিত্তি হওয়া উচিত।
আগামীর জন্য প্রস্তুতি—কেমন হওয়া উচিত?
ইরানের ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে: একটি দেশ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কীভাবে প্রস্তুত করবে? জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
প্রথমত, শিশু-কিশোরদের জন্য যেকোনো রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিতে বয়সভিত্তিক স্পষ্ট সীমা, অভিভাবকের অবহিত সম্মতি, স্বাধীন তদারকি এবং কার্যক্রমের ঝুঁকি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য থাকা জরুরি। অপ্রাপ্তবয়স্কদের অস্ত্র পরিচালনা, সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রম, নিরাপত্তা চৌকি বা সংঘাত-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব থেকে দূরে রাখতে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, নাগরিক প্রতিরক্ষার প্রশিক্ষণকে শিশুদের উপযোগী নিরাপদ ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসা, অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প বা বিমান হামলার সময় নিরাপদ আশ্রয় নেওয়া, দুর্যোগে উদ্ধারকারী সংস্থাকে সহায়তা এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা শিশুদের জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা বাড়াতে পারে। এসব কার্যক্রমে অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বা সামরিক দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন নেই।
তৃতীয়ত, শিশুদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানকে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, পরিবেশ, গবেষণা ও সামাজিক সেবায় দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ায়। নিরাপত্তার ধারণাকে শুধু সামরিক প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, যেসব শিশু ইতিমধ্যে সশস্ত্র বা নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে, তাদের নিরাপদে সেই কাঠামো থেকে বের করে আনা, শিক্ষায় ফিরিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পরিবার, বিদ্যালয়, শিশু সুরক্ষা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইরানের জানফাদা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা
ইরানের জানফাদা প্রচারাভিযান এবং শিশু-কিশোরদের সামরিক প্রশিক্ষণ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং শিশুদের সুরক্ষার দায়িত্ব কীভাবে একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়। ইরানের কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগকে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও নাগরিক প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ১২ বছর বয়সী শিশুদের নিয়োগ, অস্ত্র পরিচালনা এবং নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
এই বিতর্কের চূড়ান্ত মূল্যায়নে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ, সরকারি ব্যাখ্যা, শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা—সবই বিবেচনায় নিতে হবে। তবে একটি নীতিগত সত্য স্পষ্ট: শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার অর্থ তাদের আগেভাগে যুদ্ধের ঝুঁকিতে অভ্যস্ত করে তোলা নয়। বরং তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিকশিত করার মধ্য দিয়েই একটি দেশ দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
আগামীর ইরান কেমন হবে, তা শুধু তার সামরিক প্রস্তুতি দিয়ে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে তার শিশুরা কতটা নিরাপদে বড় হতে পারছে, কতটা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে এবং কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারছে, তার ওপরও।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, ইরান এইচআরএম ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের মহানায়ক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা কমরেড মণি সিংহের জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে শুরু হচ্ছে সাত দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী ‘কমরেড মণি সিংহ মেলা’। আগামী ৩১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ মেলা।
মেলাকে ঘিরে এরই মধ্যে দুর্গাপুরে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে দুর্গাপুরের কমরেড মণি সিংহ স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রস্তুতিমূলক মতবিনিময় সভা। মেলা উদযাপন কমিটির আয়োজনে সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ডা. দিবালোক সিংহের সভাপতিত্বে সভায় সঞ্চালনা করেন সিপিবি উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোরশেদ আলম। সভায় মেলার মাঠ প্রস্তুত, সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা, প্রচার-প্রচারণা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সভায় বক্তব্য দেন মেলা উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অজয় সাহা ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম রফিকুল ইসলাম রফিক, সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ জামাল উদ্দিন মাস্টার, বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব হোসেন তালুকদার এবং সিপিবি উপজেলা কমিটির সভাপতি আলকাছ উদ্দীন মীর।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন অ্যাডভোকেট মানেশ সাহা, দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি তোবারক হোসেন খোকন ও কবি বিদ্যুৎ সরকার। সভায় উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক, প্রবীণ সাংবাদিক নির্মলেন্দু সরকার বাবুল, সাবেক প্রধান শিক্ষক বীরেশ্বর চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট সজয় চক্রবর্তী, সাংবাদিক ওয়ালী হাসান, জুয়েল রানা, আল আমীন হাওলাদারসহ মেলা উদযাপন কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
সভায় বক্তারা বলেন, কমরেড মণি সিংহের জীবন ও সংগ্রাম দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর আদর্শ, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। মেলাটিকে সফল করতে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
আয়োজকেরা জানান, সবার সহযোগিতায় মেলাকে সুশৃঙ্খল, আনন্দমুখর ও সর্বজনীন করে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের প্রত্যাশা, এবারের মেলাও দুর্গাপুরের ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক চর্চা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে মাদক সেবন ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এক নারীসহ তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার করিকাকান্দি ও বড়খাপন গ্রামে এ অভিযান পরিচালনা করে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অভিযানে নেতৃত্ব দেন কলমাকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামছুজ্জামান আসিফ।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন করিকাকান্দি গ্রামের ফেনেশ দাসের ছেলে দিনেশ চন্দ্র দাস (৪০), বড়খাপন গ্রামের ফরেন্দ্র চন্দ্র দাসের ছেলে পূজন চন্দ্র দাস (২৪) এবং একই গ্রামের মিলন মিয়ার মেয়ে ময়না আক্তার (২২)।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নেত্রকোনা কার্যালয়ের একটি দল ওই দুই গ্রামে অভিযান চালায়। এ সময় মাদক সেবনরত অবস্থায় দিনেশ চন্দ্র দাস ও পূজন চন্দ্র দাসকে আটক করা হয়। অন্যদিকে, অভিযান চলাকালে সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ময়না আক্তারকে আটক করা হয়।
পরে ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামছুজ্জামান আসিফ দিনেশ চন্দ্র দাস ও পূজন চন্দ্র দাসকে মাদক সেবনের দায়ে তিন মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেন। এ ছাড়া সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে ময়না আক্তারকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনকে নেত্রকোনা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মৃত্যুর গুজব সম্প্রতি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে, কিছু ঘণ্টার মধ্যেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তাকে সুস্থ অবস্থায় দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র রোডং সিনমুনে প্রকাশিত ছবিতে ৪২ বছর বয়সী কিমকে তার মেয়ের সঙ্গে একটি পোশাক ও জুতার প্রদর্শনী পরিদর্শন করতে দেখা যায়। তথাপি, তার মৃত্যুর গুজব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কেন বারবার এমন দাবি সামনে আসে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার নেতার মৃত্যু নিয়ে গুজব প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তর কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম গোপনীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। দেশটির সম্পর্কে তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন, ফলে সেখানে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
যেভাবে ছড়াল সর্বশেষ গুজব
সর্বশেষ গুজবটি ছড়ান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শি। তিনি নিজেকে চীনা কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ‘চাইনিজ ডেমোক্রেটিক পার্টি’র চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। এর আগে, তিনি চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন যাচাইহীন দাবি প্রচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওয়ানজুন শির দাবি, কিম জং উন গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়েছিলেন। উত্তর কোরিয়ায় তার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় তাকে বেইজিংয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি মারা যান এবং পরে তার লাশ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, দেশটির শাসকগোষ্ঠীও নেতার মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছে।
তবে, কিমকে প্রদর্শনীতে ঘুরে বেড়ানোর ছবিগুলো তার দাবির সঙ্গে মেলে না। ছবিতে কিমকে তার মেয়ে কিম জু এ এবং নিয়মিত সহকারীদের সঙ্গে দেখা যায়। যদিও ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু গুজবটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
কিমের স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি ঘটলে উত্তর কোরিয়ার বাইরেও তার কিছু লক্ষণ দেখা যাওয়ার কথা। সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা বা শরণার্থীর ঢল সামাল দিতে চীন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে। উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক মিশনগুলোর আশপাশেও তৎপরতা বাড়তে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা প্রায়ই চীনা সীমান্তসংলগ্ন অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার খবর পান। কিন্তু এবার এ ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে বলেছেন, এসব গুজবের পক্ষে তারা কোনো তথ্য পাননি।
কিমের মৃত্যুর এই গুজব আগের কয়েকটি মিথ্যা দাবির কথাও মনে করিয়ে দেয়। ২০২০ সালে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা এক আলোচিত ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিম মারা গেছেন বলে তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’। কিন্তু কিছুদিন পর কিম জনসমক্ষে হাজির হলে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা
কিমের মৃত্যুর গুজব বারবার ছড়ানোর একটি বড় কারণ উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশটিতে গত তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার শাসন করছে। তবে কিম জং উনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা তার পূর্বসূরিদের সময়ের মতো স্পষ্ট নয়।
কিম ইল সুং তার ছেলে কিম জং ইলকে ক্ষমতার জন্য প্রস্তুত করতে কয়েক দশক সময় নিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকার পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত ছিল। ফলে কিম জং ইলের ক্ষমতা গ্রহণ তুলনামূলকভাবে মসৃণ হয়।
কিন্তু কিম জং উনের ক্ষমতায় উত্থান ছিল দ্রুত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ২০০৮ সালে তার বাবা কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর ছোট ছেলে দ্রুত পদোন্নতি পান। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর আগেই তাকে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা হয়।
এরপরও কিম জং উন বছরের পর বছর ধরে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিয়েছেন এবং সম্ভাব্য হুমকি দূর করেছেন।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কিম হয়তো তার মেয়েকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করছেন। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও সামরিক প্রদর্শনীতে মেয়ের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। তবে ধারণা করা হয়, কিম জু এ-এর বয়স মাত্র ১৩ বছর। উত্তর কোরিয়ায় এর আগে কোনো নারী দেশটির নেতৃত্ব দেননি। তা ছাড়া তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরিও ঘোষণা করা হয়নি। ক্ষমতার লড়াই শুরু হলে তার এই অল্প বয়স তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এসব অনিশ্চয়তার কারণেই কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে গুজব ব্যাপক মনোযোগ পায়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
গুজবগুলো পুরোপুরি অবিশ্বাস্য মনে হওয়ার আরেকটি কারণ কিমের স্বাস্থ্য। তিনি স্থূলকায় এবং ধূমপান করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা একাধিকবার সতর্ক করেছে, তার জীবনযাপনের ধরন তাকে হৃদ্রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলছে। কিম পরিবারে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ইতিহাসও রয়েছে।
কিমের কিছু হলে প্রতিবেশী দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য তার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। আকস্মিক নেতৃত্ব সংকট দেখা দিলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কাও বাড়বে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কি কট্টরপন্থীদের আরো আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করবে? অস্থিতিশীলতার কারণে কি চীনের সীমান্তে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে? এসব প্রশ্ন শুধু বেইজিং ও সিউলকেই নয়, ওয়াশিংটনকেও ভাবিয়ে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তথ্যের অভাব গুজব ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কিম জং উনের ওপর কড়া নজর রাখে, যাতে তার সম্পর্কে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ খবরের জন্য প্রস্তুত থাকা যায়। কিন্তু উত্তর কোরিয়া তথ্যের এক কৃষ্ণগহ্বর। তাই দেশটি সম্পর্কে মিথ্যা খবর ছড়ানোও তুলনামূলক সহজ।
দেশটির খুব কম মানুষই নিয়মিতভাবে নেতার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পান। নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও হিমশিম খেতে হয়। ফলে দেশটি সম্পর্কে প্রকাশিত অনেক তথ্যই নিশ্চিত সত্য হিসেবে নয়, বরং যাচাইহীন বা সম্ভাব্য তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করতে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় ওয়ানজুন শি কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খবর জানতে পারলেন, অথচ যাদের দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা, তারা তা জানতে পারলেন না—এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি হয়তো কেবল মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। অথবা বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক সামনে এনে চীনকে বিব্রত করতে চেয়েছেন, যদিও দুই দেশের সম্পর্ক আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত।
তবে তার উদ্দেশ্য যা-ই হোক, উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বকে ঘিরে থাকা অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে গুজব ছড়ানোর ঘটনা এটাই প্রথম নয়।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি প্রবাসী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ দেশে আনা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শাহেদের মরদেহ পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ বহনকারী উড়োজাহাজটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
এর আগে শাহেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে মরদেহ দেশে ফেরানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হয়।
গত ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক শাহেদ আহম্মেদ ছিলেন। ওই ঘটনায় আরও একজন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তিনি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি। তিনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। হামলায় আহত হন আরও ২৭ বাংলাদেশি।
হামলার ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহত হওয়ার পর নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আহতদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে নিহত শাহেদ আহম্মেদের পরিবারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শাহেদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সা’দ আল ঈসা কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি তাঁর বকেয়া বেতন-ভাতা ও সার্ভিস বেনিফিটের অর্থ বাবদ ২৭ হাজার ৩৯৫ দশমিক ৬২ সৌদি রিয়াল রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ