০৯:২১ পি.এম
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আয়ারল্যান্ডকে তার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সভাপতিত্বের সময়কালকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে আহ্বান জানিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার আইরিশ পার্লামেন্টের ইউরোপীয় সংক্রান্ত বিষয়ক কমিটির সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় আলবানিজ অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আনা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনিদের ধর্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "ফিলিস্তিনের বাকি অংশকে উপনিবেশে পরিণত করতে ইসরায়েল যা করছে, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নও সমপরিমাণ অংশীদার।" আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা রক্ষার স্বার্থে ইইউ সদস্য দেশগুলোকে গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সভাপতিত্বের সময়টিতে নেতৃত্ব দিতে আইরিশ সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
আরও পড়ুন: আটলান্টিকে নৌকা ডুবে ইউরোপে যাওয়ার পথে নিহত ২১
আলবানিজ আরও বলেন, "ইসরায়েল বরাবরই শিশুদের হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং এমনকি ধর্ষণের সাথে যুক্ত ছিল। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রথম ধর্ষণের খবর পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালে, এরপর ১৯৬৭ সালে। তবে বর্তমানে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর পেছনে তাদের একটি ধ্বংসাত্মক মানসিকতা কাজ করছে। এদের লক্ষ্য কেবল মানুষ মেরে ফেলা নয়, এটি আরও গভীর কিছু। জীবন্ত মানুষকে ধ্বংস করে দেওয়াই তাদের মূল উদ্দেশ্য। ইউরোপীয় দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়ে বন্দিদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের যে বিবরণ নির্যাতিতদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, তা পড়লেই এটি স্পষ্ট হয়।"
তিনি বলেন, "ইউরোপীয় মানুষরা এই কুকুরগুলো বিক্রি করে মুনাফা লুটছে, যা দিয়ে মানুষকে ধর্ষণ করা হবে। এটি অত্যন্ত জঘন্য। আমাদের আইনের শাসন প্রয়োগ করে এটি বন্ধ করার ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো যারা এই ব্যবস্থা নিয়ে আওয়াজ তুলছে তাদেরই জেলে পোরা হচ্ছে।" আলবানিজ তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বলেন, "আমাকে সত্যিটা বলতে দিন, আমি সত্য বলার কারণে নিজের এবং আমার পরিবারের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছি।"
ফিলিস্তিনি শিশুরা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "ইসরায়েল যা করছে আমরা কি তা উপলব্ধি করতে পারছি?" নিজের ও পরিবারের ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান, মাত্র এক মাস আগেই তার সন্তানরা যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন তাদের বাড়িতে কিছু লোক ঢুকে পড়েছিল। তাই ঝুঁকির সম্মুখীন হওয়া কী জিনিস, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
তিনি বলেন, আয়ারল্যান্ড সরকারের উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সভাপতি পদে থাকার সুযোগ নিয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়া, যাতে অন্য দেশগুলোও সাহসের সাথে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত হয়।
আরও পড়ুন: জার্মান পার্লামেন্টের সামনে জাতীয় পতাকা সরিয়ে ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলন
রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "ইইউ সভাপতিত্ব আয়ারল্যান্ডের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আয়ারল্যান্ডের প্রতিশ্রুতি যে যুগের দাবি, তা প্রমাণ করার সময় এসেছে। ইউরোপীয় মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে একটি আদর্শিক নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে, যা যুদ্ধ, শোষণ, নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে পরিবেশ ও সমস্ত জীবকুলকে রক্ষা করতে সক্ষম।"
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতিকে শব্দ দিয়ে প্রকাশ করার মতো নয় বলে বর্ণনা করেন তিনি। তিনি যোগ করেন, "তথাকথিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে। গাজায় ইসরায়েল ক্রমাগত তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ফলে ফিলিস্তিনি জনগণ বর্তমানে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূখণ্ডের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছে।"
"গত তিন বছরেরও বেশি সময়ে ইসরায়েল ৭৪,৫০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে অন্তত ২১,৭০০ জন শিশু রয়েছে। অর্থাৎ গত ১,০৯৫ দিন ধরে গড়ে প্রতিদিন ২০ জন করে শিশু মারা গেছে।"
"গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পরিবারগুলো ধ্বংসাবশেষ, মানবদেহের অবশিষ্টাংশ, কীটপতঙ্গ, ইঁদুর ও নানা রোগের মধ্যে বসবাস করছে। এর ওপর ইসরায়েলি হামলা এবং ত্রাণ সহায়তার ওপর বাধা নিষেধ এখনো অব্যাহত রয়েছে। সামনে আবার শীতকাল আসছে।"
আরও পড়ুন: হুথিদের সৌদি আরবের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলার দাবি
তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থায়নের অভাব মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে চরম বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এর মতো বহিরাগত শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবগুলো ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে সরাসরি ক্ষুণ্ণ করছে।
আলবানিজ উল্লেখ করেন, আয়ারল্যান্ডে তার এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত তিন বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো 'আইনহীনতার শাসন' প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রভাবশালী স্বার্থের মদদে তারা এমন এক বিশ্ব গড়ছে যেখানে ন্যায়বিচারের ওপর জোর-জুলুমের জয় হচ্ছে।
তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এর সদস্য দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা বজায় রাখতে অবিলম্বে নিজেদের নীতি পরিবর্তন করতে হবে।
আইরিশ পার্লামেন্টে দেওয়া ফ্রান্সেসকা আলবানিজের এই কড়া বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আয়ারল্যান্ডের একটি ইহুদি প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠী এবং ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দাবি করলেও আলবানিজের অতীতে ইহুদিবিদ্বেষের (অ্যান্টিসেমিটিজম) ইতিহাস রয়েছে এবং তিনি প্রায়শই ইসরায়েল ও ইহুদিদের নিয়ে চরমপন্থী মন্তব্য করে থাকেন।
আরও পড়ুন: মেলানিয়া ট্রাম্পের ৭২ লাখ ডলারের বৃত্তি তহবিল শিক্ষার্থীদের জন্য সুখবর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন