ঢাকা সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ১৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ইং ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং
তানোরে কৃষকের কান্না কেউ শোনে না

কৃষিপণ্যের দরপতনে বিপাকে তানোরের কৃষক, লোকসানের শঙ্কায় হতাশা


কৃষিপণ্যের দরপতনে বিপাকে তানোরের কৃষক, লোকসানের শঙ্কায় হতাশা

রাজশাহীর তানোরে কৃষিপণ্যর দরপতনে কৃষকরা দুঃখের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ও চরম সংকটের মুখোমুখি। তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনের পরদিন পরিশ্রম করে উৎপাদন করা কৃষিপণ্যগুলো এখন সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থার অভাবে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। ফলে প্রতি মুহূর্তে তারা একের পর এক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। অবগত সূত্রে জানা গেছে, আলুর পর এবার আমের দরপতন ঘটেছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকদের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমনও কিছু আছে যারা শেষ সম্বলটুকু হারিয়েছে। নতুন খবর হচ্ছে, এনজিও ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারার কারণে কিছু কৃষক এলাকায় চলে গেছে।

এদিকে, তানোরে আলুর জমিতে রোপণ করা বোরো ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। তবে মাঠের নতুন ধানের পাশাপাশি গাছে পাকা আম ঝুললেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। ধান ও আমের দাম বাজারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচ তুলতে পারার শঙ্কায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এখন ধান প্রতি মণ (৪০ কেজি) বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, বর্তমান উৎপাদন খরচের সাথে এ দাম কোনোভাবেই অপার্যाप्त নয়।

উপজেলার কলমা ইউনিয়নের (ইউপি) বিল্লী গ্রামের কৃষক সারোয়ার জাহান চলতি মৌসুমে ২০ বিঘা জমিতে ব্রি-৭৬ জাতের বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “মঙ্গলবার আমি ধান কেটে মাড়াই সম্পন্ন করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির জন্য যাই। কিন্তু কেউ কেনার আগ্রহ দেখায়নি। শেষে একজন ব্যবসায়ী ৮০০ টাকা মণ দরে কিনতে রাজি হয়।” তিনি জানালেন, এ দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচও উঠবে না। বরং তার এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে।

আরও পড়ুন: ঈশ্বরদীতে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে প্রাণ গেল খামারির

তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পবা ও নওগাঁর মান্দা উপজেলার হাজারো কৃষকও উপঢৌকনে একই অবস্থায়। তারা বলছেন, সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ বাড়ায় ধানের উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়েছে। অথচ তারা বর্তমানে বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন।

অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হলেও বর্তমান মৌসুমে আমের বাজারে ভয়াবহ দরপতন ঘটেছে। চাষিরা অভিযোগ করেন, গত এক দশকের মধ্যে এবার আমের দাম সবচেয়ে কম। বাজারে ক্রেতার অভাব থাকার কারণে অনেক বাগানে পাকা আম গাছেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন জাতের আম প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে কৃষকরা জানাচ্ছেন, যদি চলতি মৌসুমে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে অনেক বাগান মালিক বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি হয়ে পড়বেন।

তানোর পৌরসভার কালীগঞ্জহাট মহল্লার কৃষক রনি চলতি মৌসুমে ৩০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। বর্তমানে তার আলু হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন, “এখন প্রতি কেজি আলু মাত্র সাড়ে ১৭ টাকা। অথচ উৎপাদন খরচ ও হিমাগার ভাড়া মিলে আমার প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে প্রায় ২৪ টাকা। দাম না বাড়লে আমার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরও আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে বহু কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকেই ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। চলতি বছরেও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, পেঁয়াজ ও রসুন চাষেও হতাশা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় এবং রসুন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, এ দামে উৎপাদন খরচ উঠানো সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: ঘুষের ভিডিও ভাইরাল, বরিশালের ভূমি অফিসের ২ কর্মচারী প্রত্যাহার

তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের দুই রসুন চাষি সাদেক ও তার সহযোগীরা জানান, গত বছর দুই বিঘা জমিতে তারা রসুন চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। এবারও দুই বিঘা জমিতে রসুন চাষ করেছেন, তবে বাজারমূল্য কম থাকার কারণে তারা রসুন বিক্রি না করে বাড়িতে সংরক্ষণ করছেন। তারা জানান, “গত বছরের মতো এবারো দাম না পেলে আমরা আগামীতে আর রসুন চাষ করবো না।”

স্থানীয় কৃষকগণ রসুন উৎপাদন করলেও বিদেশি রসুন আমদানির কারণে তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। রসুন চাষিদের মতে, দেশে উৎপাদিত রসুন দিয়েই অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু আমদানি নির্ভর নীতির কারণে স্থানীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষকদের অভিযোগ, একটির পর এক ফসল কার্যকর লোকসান হচ্ছে বলে তারা ব্যাংক ক্লোজিংয়ের কারণে ধান ক্রয়ে ধীরগতি অবলম্বন করছেন। এর ফলে বাজারে ধানের চাহিদা কমে যাচ্ছে এবং দাম নিম্নমুখী হচ্ছে। তাদের দাবী, জুলাই মাস থেকে ধানের বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে কৃষকেরা বলছেন, প্রতি বছর একই ধরনের অজুহাত দেখানোর মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হচ্ছে না। কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মন্তব্য করছেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি ক্রয় এবং আমদানি নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। কৃষকদের মত অনুযায়ী, তাদের যদি ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়তে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর, যা গতবারের চেয়ে ১২০০ হেক্টর কম। গত মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার ১১৫ হেক্টর। দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, তাদের কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগ বালাই আছে কি না এবং রোগ বালাই হলে দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দামের বিষয় কৃষি বিপণন বিভাগের কাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তানোরে চলতি মৌসুমে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ হাজার ২০০ হেক্টর, কিন্তু চাষাবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর, ৭০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি।

আরও পড়ুন: মহেশখালীতে ট্রলি গাড়ি উল্টে শ্রমিক আনোয়ার হোসেন নিহত

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ভাঙ্গুড়ায় কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ ও চারা বিতরণের অনুষ্ঠান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ ইং

১২:৩৪ এম


ভাঙ্গুড়ায় কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ ও চারা বিতরণের অনুষ্ঠান

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা এবং কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। আজ বুধবার (২৪ জুন) উপজেলার কৃষি অফিস চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান।

এ সময় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন জাহান, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এফএম কামারুম মুনিরা প্রমুখ। অনুষ্ঠান চলাকালীন বক্তারা বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে চারা ও কৃষি সহায়তার প্রদান অব্যাহত আছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার নির্বাচিত কৃষকদের মধ্যে উন্নত জাতের বীজ, ফলজ ও বনজ গাছের চারা বিতরণ করা হয়ে থাকে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখার আহ্বান করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত কৃষকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা ও কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়। কৃষকরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর
সাঁথিয়ায় গ্রামীণ সড়কের কোর রোড নেটওয়ার্ক

সড়ক অগ্রাধিকার ও তথ্য যাচাইকরণ কর্মশালা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ ইং

১২:৩৬ এম


সড়ক অগ্রাধিকার ও তথ্য যাচাইকরণ কর্মশালা

পাবনার সাঁথিয়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের(এলজিইডি) আয়োজনে ও বেটস কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেডের পরামর্শে গ্রামীণ সড়ক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন(জিআইএস-ভিত্তিক) আরসিআইপি, গ্রামীণ সড়কের কোর রোড নেটওয়ার্ক, সড়ক অগ্রাধিকার ও তথ্য যাচাইকরণ বিষয়ক কর্মশালা বুধবার (২৪ জুন) উপজেলা পরিষদ হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সাঁথিয়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. জহুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এলজিইডি পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিজু তামান্না। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জিআইএস স্পেশালিষ্ট, বেটস এর প্রকৌশলী শিমুল কুমার কুন্ডু।

কর্মশালায় জানানো হয়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়ন ও এলজিইডির বাস্তবায়নে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর থেকে সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন কাজ শুরু হবে। এসব সড়ককে পর্যায়ক্রমে প্রশস্ত ও আধুনিকায়ন করা হবে, যাতে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত ও নিরাপদ হয়।

বক্তারা বলেন, কোর রোড নেটওয়ার্ক নির্ধারণ গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সড়ক উন্নয়নের ফলে সাঁথিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগ সহজ হবে, যাতায়াতের সময় কমবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সরকারের এ উন্নয়ন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে উপস্থিত সকলে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

কর্মশালায় উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী ও এলজিইডি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

তৃতীয় ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার গুরুত্ব: জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাস্তবায়নের রূপরেখা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অনলাইন ডেস্ক

বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ ইং

১২:৩৭ এম


তৃতীয় ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার গুরুত্ব: জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাস্তবায়নের রূপরেখা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থেকে দেশে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠানো দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এই রেমিট্যান্সের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি তেলসমৃদ্ধ দেশ— Saudi Arabia, United Arab Emirates, Oman, Qatar, Kuwait এবং Bahrain— একাই মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫% থেকে ৪৭% সরবরাহ করে। এসব অবদানের সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ভাষাগত সমস্যার কারণে নানা ধরনের সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে আরবি ভাষা শেখার বাধ্যতামূলক বিষয় হিসাবে এখনও দেখা হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো দেশের কর্মসংস্থানের জন্য যেখানে ভাষা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এটি দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে অধিকাংশ কর্মী বিদেশ যাওয়ার আগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরবি শেখার সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন না। প্রবাসগামী কর্মীদের জন্য মাত্র তিন দিনের একটি বাধ্যতামূলক ‘প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন’ (PDO) চলমান রয়েছে, যেখানে একটি ছোট বইয়ের মাধ্যমে কিছু সাধারণ শব্দ শেখানো হয়। কিন্তু এত স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ বাস্তব জীবনের যোগাযোগ দক্ষতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, দেশের টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে (TTC) জাপানি বা কোরিয়ান ভাষার কোর্স থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক আরবি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত।

এছাড়া বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া অধিকাংশ কর্মী অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হিসেবে নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা বা কৃষি খাতে কাজ করছেন। এসব কর্মস্থলে সহকর্মীদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের হওয়ায় বাংলা কিংবা অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় ভাষায় কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ফলে স্থানীয় আরবি ভাষাভাষীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। আবার যারা কিছুটা প্রমিত আরবি (ফুসহা) শিখে যান, তারাও মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে মিল না পাওয়ায় কার্যকরভাবে ভাষাটি ব্যবহার করতে পারছেন না।

ভাষা শেখার প্রতি অনাগ্রহ ও সচেতনতার অভাবও এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। অধিকাংশ অভিবাসী কর্মী দ্রুত বিদেশে যাওয়াকেই অগ্রাধিকার দেন; ভাষা শেখার পেছনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করার মানসিকতা বা সামর্থ্য তাদের অনেকের থাকে না। এর ফলে, ফিলিপাইন, ভারত বা শ্রীলঙ্কার কর্মীদের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা ভাষা দক্ষতায় পিছিয়ে পড়েন, এবং তুলনামূলক কম বেতনের কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হন। এই ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৫২% বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মক্ষেত্র, চিকিৎসাসেবা এবং দৈনন্দিন জীবনে তীব্র যোগাযোগ সমস্যার সম্মুখীন হন, যা তাদের জীবনমান ও কর্মদক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

মূল দ্বন্দ্ব হলো: বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ জনশক্তি পাঠালেও আরবি ভাষা না জানার কারণে তারা "অদক্ষ শ্রমিক" হিসেবে কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অপরদিকে, ভাষা শেখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ করার চেয়ে যেকোনো উপায়ে দ্রুত কর্মী বিদেশে পাঠানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভাষা না জানার কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস (প্রায় ৫০%)। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান আধুনিক অর্থনীতিতে (যেমন: সৌদি ভিশন ২০৩০) উচ্চ বেতনের পেশাদার কর্মী পাঠাতে আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে কেবল "জনশক্তি রপ্তানির বাজার" এবং "আর্থিক সাহায্যের উৎস" হিসেবে দেখে এসেছে, সমমর্যাদার রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে নয়। আরবি ভাষায় দক্ষ কূটনৈতিক ও থিংক-ট্যাঙ্কের অভাবে বাংলাদেশ আরব বিশ্বের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে না, যা বহুমাত্রিক কূটনীতিতে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি করে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ওআইসি (OIC) এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (IDB) মতো সংস্থায় বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান প্রয়োজন। আরবি ভাষাকে তৃতীয় দাপ্তরিক বা কৌশলগত ভাষা হিসেবে গ্রহণ করলে আরব বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের সাথে সরাসরি ও গভীর লবিং ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ হলেও আরবি ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাবে মাঠপর্যায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে পিছিয়ে পড়ে। ইংরেজি ও বাংলার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামরিক বাহিনীকে আরব অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণে পূর্ণ নেতৃত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে রাখছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একটি বড় অংশই পরিচালিত হয় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (MENA) আরবি ভাষাভাষী অঞ্চলে। সৌদি আরব বা ইউএই-এর মতো দেশের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং যৌথ সামরিক মহড়া দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশীয় শক্তির (ভারত ও চীন) টানাপোড়েন সামলাতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আরব বিশ্বের সাথে যে মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষাগত সেতুবন্ধন প্রয়োজন, তাকে দীর্ঘকাল ধরে একটি "সেকেন্ডারি অপশন" বা গৌণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বৈশ্বিক মঞ্চে (যেমন জাতিসংঘ বা ওআইসি) রোহিঙ্গা সংকট বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে ১৭ কোটি মুসলিমের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে আরব বিশ্বের জোরালো সমর্থন প্রয়োজন। আরবি ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব: মধ্যপ্রাচ্যে বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে (GCC) বাংলাদেশের লাখ লাখ অভিবাসী কর্মী কাজ করলেও তারা মূলত কম বেতনের অদক্ষ শ্রমে (Blue-collar jobs) নিয়োজিত। আরবি ভাষাকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে আয়ত্ত করলে বাংলাদেশ এই বিশাল জনশক্তিকে রিটেল, হসপিটালিটি, এভিয়েশন এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো উচ্চ আয়ের পেশাদার খাতে (White-collar jobs) রূপান্তর করতে পারবে। এটি 'সৌদি ভিশন ২০৩০'-এর মতো মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক শ্রমবাজারের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ফিলিপাইন বা ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে সমকক্ষ করে তুলবে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মূল ভিত্তি হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স (মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক)। তবে আরবি ভাষা না জানার কারণে বাংলাদেশি কর্মীরা অন্য দেশের তুলনায় ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কম বেতন পান এবং দালালের খপ্পরে পড়ে হুন্ডির মতো অবৈধ পথে টাকা পাঠান। কর্মীদের আরবি ভাষায় দক্ষ করা গেলে তাদের গড় আয় ও দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে একই সংখ্যক জনশক্তি থেকেই বৈধ চ্যানেলে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি রেমিট্যান্স দেশে আনা সম্ভব।

মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক মূলত একমুখী—বাংলাদেশ শুধু জনশক্তি রপ্তানি করে আর সেখান থেকে জ্বালানি তেল ও ঋণ আমদানি করে। আরবি ভাষার কৌশলগত ব্যবহার আরব বিশ্বের বড় বড় তহবিল (যেমন: সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড) এবং করপোরেট জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে সেতু হিসেবে কাজ করবে। এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতিই কমাবে না, বরং বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি সাধারণ 'দাতা-গ্রহীতা'র অবস্থান থেকে উন্নীত করে একটি শক্তিশালী 'অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য: বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ইসলামের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, যার মূল ভিত্তি আরবি ভাষা। তবে এই সংযোগটি প্রধানত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত এবং আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আরবি ভাষাকে কৌশলগত গুরুত্ব দিয়ে তৃতীয় ভাষা হিসেবে চর্চা করলে মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস এবং দর্শনের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি ও জীবন্ত সংযোগ তৈরি হবে। এটি ধর্মীয় আবেগ ও অনুভূতিকে একটি বাস্তবমুখী, আন্তর্জাতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে রূপান্তর করবে।

বাংলাদেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার (আলিয়া ও কওমি) মাধ্যমে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করে। কিন্তু আধুনিক ও ফলপ্রসু যোগাযোগ দক্ষতার (Communicative Arabic) অভাবে এই শিক্ষার্থীরা দেশের মূলধারার অর্থনীতি বা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না। মাদ্রাসার এই ঐতিহ্যিক আরবি শিক্ষাকে যদি পেশাদার ও আধুনিক যোগাযোগমুখী করা যায়, তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক অনুবাদক, কূটনৈতিক উপদেষ্টা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চপদে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। এটি মাদ্রাসা শিক্ষাকে একটি বিশাল মানবসম্পদে রূপান্তর করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি প্রবাসীরা তীব্র শারীরিক পরিশ্রম করার সত্ত্বেও কেবল ভাষা ও সংস্কৃতির দূরত্বের কারণে স্থানীয় সমাজে যথাযথ সামাজিক সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পান না। আরবি ভাষায় সাবলীলতা আরবদের মনে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আপনত্ব তৈরি করবে। এটি কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও সামাজিক দূরত্ব কমিয়ে প্রবাসীদের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করবে। একই সাথে, দেশের ভেতরেও আরবি জানা ব্যক্তিদের একটি উচ্চ সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা সৃষ্টি হবে।

নীতি ও শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সনাতন আরবি ব্যাকরণ ও ধর্মীয় টেক্সট পড়ানোর শিক্ষকরা অনেক থাকলেও, আধুনিক ও ফলপ্রসূ যোগাযোগের ভাষা (Communicative and Functional Arabic) শেখানোর দক্ষ শিক্ষকের চরম সংকট রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আরবিতে সাবলীলভাবে কথা বলা, লেখা এবং পেশাদার অনুবাদে দক্ষ শিক্ষকের অভাব একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিগণিত। ফলে শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর আরবি পড়লেও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাষাটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে না।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় (বিশেষ করে মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে) আরবির যে পাঠ্যক্রম রয়েছে, তা মূলত তাত্ত্বিক, সাহিত্যিক ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক বাণিজ্য, কূটনীতি, প্রযুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উপভাষাগুলোর (Dialects) কোনো প্রতিফলন এই পাঠ্যক্রমে নেই। এই আধুনিক ও প্রয়োগিক সিলেবাসের ঘাটতির কারণে ডিগ্রি অর্জন করার পরও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক করপোরেট ক্ষেত্র বা কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অযোগ্য আবিষ্কার করে।

বৈশ্বিক ক্যারিয়ার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইংরেজিকে প্রথম এবং প্রধান আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, উচ্চ বেতন ও নিশ্চিত চাকরির আকর্ষণে দেশের তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ বর্তমানে কোরিয়ান, জাপানি কিংবা জার্মান ভাষা শেখার দিকে ঝুঁকছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে আরবি ভাষাকে কেবল একটি "ধর্মীয় অনুষঙ্গ" হিসেবে দেখার কারণে এটি আধুনিক তরুণদের কাছে ক্যারিয়ার গড়ার ভাষা হিসেবে আকর্ষণ হারাচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরবিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভাষা হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে না পারাটাই এই প্রতিযোগিতায় আরবির পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ।

জাতীয় শিক্ষানীতি: কৌশলগত দূরদর্শিতার অভাব ও আরবির প্রান্তিককরণ

বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতিতে ইংরেজিকে একমাত্র আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং ক্যারিয়ারের ভাষা হিসেবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও ভূ-রাজনীতিতে আরবির বিশাল কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও একে শিক্ষানীতিতে গোটা মাত্র একটি 'ঐচ্ছিক' বা 'ধর্মীয় বিষয়' হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষানীতিতে পরিবর্তন এনে আরবিকে একটি 'অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ভাষা' (Commercial Language) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। ভাষাটিকে আধুনিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (Vocational Education) সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার অভাব এখানে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

মাদ্রাসা শিক্ষা বনাম সাধারণ শিক্ষার ভূমিকা: ভাষাগত বিভাজন ও সমন্বয়ের অভাব

বাংলাদেশে আরবির প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা সম্পূর্ণভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকেন্দ্রিক, যেখানে ভাষাটিকে মূলত ধর্মীয় টেক্সট ও ঐতিহ্যগত ব্যাকরণ বোঝার মাধ্যম হিসেবে পড়ানো হয়—আধুনিক যোগাযোগের জন্য নয়। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষায় (স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়) আরবির উপস্থিতি একেবারেই নামমাত্র, যার ফলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী ও চিকিৎসকেরা মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চ আয়ের বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না। এই দুই ধারার মধ্যে তীব্র বিভাজনের ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা আরবি জানলেও আধুনিক দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন, আর সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়েও ভাষা না জানার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জিততে এই দুই ধারার সমন্বয়ে একটি 'যোগাযোগমুখী আরবি' (Communicative Arabic) কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য।

মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তিনটি দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ । তবে বাংলাদেশে আরবির ব্যবহার মূলত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মতো ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। অপরদিকে, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া আরবিকে কেবল ধর্মীয় আচার হিসেবে না রেখে একে ইসলামিক ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক হালাল বাণিজ্য এবং উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে বাস্তবমুখী রূপ দিয়েছে। তারা ধর্মীয় সংযোগকে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে (Economic Force) রূপান্তর করেছে।

বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক পাঠায়, যারা ভাষা না জানার কারণে সর্বনিম্ন মজুরি পায়। এর বিপরীতে, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া আরবি ভাষার দক্ষতাকে মধ্যপ্রাচ্যের (GCC) সাথে উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে (Economic Diplomacy) ব্যবহার করে। মালয়েশিয়া তাদের ভাষাগত সেতুবন্ধন কাজে লাগিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম তহবিল (যেমন: সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড) থেকে বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে আরবিকে ধর্মীয় ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে। কিন্তু মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় আরবি ভাষাকে একটি কৌশলগত 'আন্তর্জাতিক ভাষা' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (Kemenhan) তাদের সামরিক বাহিনীর আন্তর্জাতিক মিশন, কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত অপারেশনের জন্য সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরবি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করেছে। সাধারণ শিক্ষা ও সামরিক নীতিতে আরবির এই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অন্তর্ভুক্তি তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।

সুপারিশমালা (Policy Recommendations)

বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে আরবি ভাষাকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:

১. শিক্ষানীতির আধুনিকায়ন ও ব্র্যান্ডিং: আরবিকে কেবল ধর্মীয় বিষয় হিসেবে না দেখে একটি 'কৌশলগত অর্থনৈতিক ভাষা' হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ধারায় (স্কুল-কলেজে) আইটি ও কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি 'যোগাযোগমুখী আরবি' (Communicative Arabic) ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে চালু করা প্রয়োজন।

২. মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়: মাদ্রাসা শিক্ষার সনাতন পাঠ্যক্রমে মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ব্যবসা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক উপভাষার (Dialects) উপাদান যুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে, সাধারণ ধারার দক্ষ পেশাদারদের (ডাক্তার, প্রকৌশলী, নার্স) জন্য বিশেষায়িত ক্র্যাশ কোর্স চালু করতে হবে।

৩. বিদেশে যাত্রার পূর্বে বাধ্যতামূলক দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ: মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের জন্য ৩ দিনের নামমাত্র ওরিয়েন্টেশনের পরিবর্তে সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে (TTC) ন্যূনতম ৩ মাসের বাধ্যতামূলক ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন কোর্স চালু করতে হবে।

৪. কূটনৈতিক উইং ও থিংক-ট্যাঙ্ক গঠন: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরবি ভাষায় উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন বিশেষায়িত কূটনৈতিক দল গঠন করতে হবে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের নীতিনির্ধারক ও করপোরেট জায়ান্টদের সঙ্গে সরাসরি লবিং করার ক্ষমতা রাখবে।

উপসংহার: একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে তার ঐতিহ্যগত 'সস্তা শ্রম রপ্তানিকারক' দেশের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য কেবল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বা রেমিট্যান্সের উৎস নয় বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক বিশাল ক্ষেত্র। ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশগুলো ভাষাগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চ আয়ের বাজার ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানগুলো দখল করে নিয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চোখ খোলার মতো উদাহরণ।

আরবি ভাষাকে বাংলাদেশের 'তৃতীয় কৌশলগত ভাষা' হিসেবে গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। যথাযথ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষানীতির দূরদর্শী সমন্বয়ের মাধ্যমে এই ভাষার বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ তার প্রবাসী আয়ের গুণিতক বৃদ্ধি করতে পারবে। একই সাথে বৈশ্বিক মঞ্চে দেশ এক নতুন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ভূরুঙ্গামারী সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৫৩ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মোঃ মাইদুল ইসলাম ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম)

বৃহস্পতিবার, ২৫শে জুন, ২০২৬ ইং

১২:৩৮ এম


ভূরুঙ্গামারী সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৫৩ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ
 
কুড়িগ্রামের সীমান্ত এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে ৫৩ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বুধবার (২৪ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি)-এর অধীন ধলডাঙ্গা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকার মাস্টারপাড়া নামক স্থানে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
 
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে সীমান্ত এলাকা থেকে ৫৩ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ করা হয়। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
 
কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুব-উল-হক বলেন, সীমান্তে পুশইন প্রতিরোধসহ যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় বিজিবি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি প্রতিটি বিওপি থেকে বিশেষ টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
 
তিনি আরও বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ দমনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
 
জব্দকৃত গাঁজার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে বিজিবি জানিয়েছে।
 
 
 

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ১৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৫
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৭
মাগরিব ০৫:২৪
ইশা ০৬:৩৫
সূর্যোদয় : ০৬:০১ সূর্যাস্ত : ০৫:২৪
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%