০৩:০৯ পি.এম
ইরান ‘আক্রমণাত্মক’ সামরিক নীতির ঘোষণা করেছে, যা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে পরিবর্তন। দেশটির সামরিক বাহিনী জানাচ্ছে যে, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামরিক মতবাদ ধীরে ধীরে ‘আক্রমণাত্মক’ নীতিতে সরে যাচ্ছে।
এছাড়া ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যদি দেশটিতে কোনও স্থল অভিযান হয়, তাহলে মার্কিন সেনা হত্যা বা আটক করা হলে একটি পুরস্কারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য প্রদান করেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া।
আরও পড়ুন: লিমোজের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন, ৩৪ বছর বয়সী সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার
তিনি বলেন, অতীতে ইরানের সামরিক মতবাদ ছিল প্রতিরক্ষামূলক। কিন্তু সাম্প্রতিক ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ এবং ‘৪০ দিনের যুদ্ধের’ অভিজ্ঞতা থেকে সেই অবস্থানে পরিবর্তন ঘটেছে।
তিনি আরো বলেন, “সামরিক মতবাদ অতীতে প্রতিরক্ষামূলক ছিল। তবে এই দুই যুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, সামরিক মতবাদ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”
তবে আক্রমণাত্মক সামরিক মতবাদ গ্রহণের ফলে সব ক্ষেত্রে আগাম হামলা চালানো যাবে না বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, এর অন্যতম দিক হবে শত্রুর হামলার দ্রুত ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে প্রাথমিক হামলার চেয়েও বিস্তৃত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া।
আকরামিনিয়া দাবি করেন, যুদ্ধের এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে সরাসরি প্রবেশের আগেই ইরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। তার দাবি মতে, ওই হামলায় মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম, স্থাপনা ও জনবলের ‘গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি’ হয়।
আরও পড়ুন: যেসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে না ইরান
তিনি বলেন, নতুন এই সামরিক মতবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, ইরানের ওপর কোনও হামলা হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা আঘাত দেওয়া। সেই জবাব শুধুমাত্র প্রতিপক্ষের হামলার সমপরিমাণ হবে না, বরং আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তার মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর মাধ্যমে দ্রুত ও বিস্তৃত পাল্টা হামলা এবং কিছু ক্ষেত্রে আগাম অভিযান পরিচালনা করার মাধ্যমে ইরানের সামরিক মতবাদের এই পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়েছে।
মার্কিন সেনা হত্যা বা আটকে পুরস্কারের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে, আকরামিনিয়া বলেন, ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান মোকাবেলায় সেনাবাহিনী একটি বিশেষ পুরস্কার কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে।
তিনি জানান, যদি কোনও মার্কিন সেনা ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং তাকে হত্যা বা আটক করা হয়, তাহলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য অথবা বৈধ শিকারি নাগরিককে ৫ বিলিয়ন তোমান পুরস্কার দেয়া হবে। এই অর্থের মান প্রায় ২৬ হাজার ডলার।
আরও পড়ুন: ৩৬৭ দিন ধরে চলা তাপঝড়ের প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ এলাকায়
নারীদের ক্ষেত্রে, তারা যদি কোনও মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করে, তাহলে পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ১০ বিলিয়ন তোমান, অর্থাৎ প্রায় ৫৩ হাজার ডলার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আকরামিনিয়া জানান, অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রটিও তার মূল্যের দ্বিগুণ দামে কেনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। পরে এই অস্ত্রটি মালিকের নামসহ সামরিক জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে এবং তাকে একটি বিকল্প অস্ত্র প্রদান করা হবে।
সামরিক কমান্ড কাঠামোয় পরিবর্তনের ব্যাপারে তিনি জানান, ইরানের সামরিক বাহিনীর কাঠামোতে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সকে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সঙ্গে একীভূত করার লক্ষ্য হলো ইরানের সেনাবাহিনীকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা। এটির মাধ্যমে বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং ঐক্যবদ্ধ কমান্ড ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
আরও পড়ুন: জাপানে লাখো মানুষ ঘরবন্দী, বের হতে চান না কেন?
আকরামিনিয়া আরো দাবি করেন যে, এই একীভূত কাঠামোর ফলে হুমকির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি, সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয়ও আরও কার্যকর হবে।
কাতারে নিখোঁজ তিন ইরানি পাইলটের বিষয়ে তিনি জানান, ইরানের চারজন এসইউ-২৪ যুদ্ধবিমানের পাইলটের বিষয়ে কাতারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় অংশ নেওয়া চার পাইলটের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ কাজেমি নিহত হয়েছেন এবং পরে তাকে ইরানের শিরাজ শহরে দাফন করা হয়েছে। তবে বাকি তিন পাইলটের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
আকরামিনিয়া বলেন, বিষয়টি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনী কাতার এবং আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি মাধ্যমে অনুসরণ করবে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের দর কমেছে, শক্তিশালী অস্ট্রেলীয় মুদ্রা
তিনি কাতারকে ওই তিন পাইলটের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আকরামিনিয়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
তার দাবি হল, এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর গঠন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
আকরামিনিয়া বলেন, ভবিষ্যতে ওই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখে একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আগের চেয়ে কমেছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ৩ লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে
ইরানের সেনাবাহিনীর এই বক্তব্য সেই মুহূর্তে এসেছে, যখন সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দেশটি তার সামরিক কৌশল ও কমান্ড কাঠামো নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আরও সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক কৌশলে যাওয়ার এই ঘোষণা ভবিষ্যতে ইরানের আঞ্চলিক সামরিক কর্মকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন