০৯:৫৩ এম
বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের বিস্তার ও স্থায়িত্ব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় স্বল্পস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা দেওয়া তাপপ্রবাহ এখন বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, কখনো কখনো মাসের পর মাস স্থায়ী হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতে, এমন বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহকে ‘তাপঝড়’ বা ‘হিট স্টর্ম’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী একটি রেকর্ড গড়া তাপঝড় পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় প্রভাব ফেলেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচটি তাপঝড় সক্রিয় থাকলেও চলতি দশকে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০২টিতে। গত ছয় দশকের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিবর্তন শনাক্ত করেছে সংস্থাটি।
কী এই তাপঝড়?
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
রয়টার্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো স্থানে টানা পাঁচ দিন বা তার বেশি সময় অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করলে তাকে তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর যদি এমন তাপপ্রবাহ পৃথিবীর মোট আয়তনের অন্তত এক শতাংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তবে তাকে ‘তাপঝড়’ বলা হয়।
বিশ্বের ১০ লাখের বেশি ভৌগোলিক এলাকার ১৯৬০ সাল থেকে প্রতিদিনের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে রয়টার্স। এ গবেষণায় দুই ডজন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকের মতামতও নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি প্রায় ৪৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল। আটলান্টিক মহাসাগর, লাতিন আমেরিকার কিছু অংশ ও পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে বিস্তৃত ওই তাপপ্রবাহ পৃথিবীর প্রায় ছয় শতাংশ এলাকায় প্রভাব ফেলেছিল।
অন্যদিকে, চলতি দশকের সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি ৩৬৭ দিন স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় কোনো না কোনো সময়ে প্রভাবিত করে। এই পরিস্থিতিতে তাপপ্রবাহের বিস্তার ও স্থায়িত্ব উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ‘নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি আস্থার অভাব’, বুথফেরত জরিপে মন্তব্য আইজেনকোটের
তাপঝড়ের ভয়াবহ প্রভাব
তাপঝড়ের প্রভাব শুধুমাত্র অসহনীয় গরমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘস্থায়ী তাপমাত্রা বৃদ্ধি মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে খরা তীব্র করতে পারে, দাবানলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য তাপজনিত অসুস্থতায় প্রাণহানির আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী তাপঝড়ের সময় সৌদি আরবের মক্কায় হজ চলাকালে তাপমাত্রা ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবানল পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
এছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে লিবিয়ার দেরনা শহরে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তবে এসব দুর্যোগের প্রতিটির সঙ্গে তাপঝড়ের সরাসরি কারণগত সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: বোম্বে হাইকোর্ট ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নোটিশ স্থগিত করেছে
জলবায়ু পরিবর্তন কতটা দায়ী?
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে চলতি দশক পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে তাপপ্রবাহ ও তাপঝড়ে আক্রান্ত পৃথিবীর গড় অংশ বেড়েছে ১২ গুণেরও বেশি।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে এবং অনেক অঞ্চলে চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানির পর্যায়ক্রমিক ঘটনা এল নিনোও নির্দিষ্ট সময়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিউজিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের অধ্যাপক জেমস রেনউইকের মতে, তাপঝড় বৈশ্বিক সভ্যতার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ তাপ। দীর্ঘস্থায়ী চরম গরমের ফলে খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ, প্রাণহানি এবং সীমিত সম্পদ নিয়ে সংঘাতের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আরও পড়ুন: সুদানে স্বর্ণের খোঁজে শ্রমিকেরা জীবন ঝুঁকিতে, খনিতে প্রাণ হারাচ্ছেন
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানো না গেলে দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষিনির্ভর অঞ্চল এবং যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও শীতল থাকার ব্যবস্থা নেই, সেসব জায়গায় এর প্রভাব বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার, পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ নিশ্চিত, কর্মক্ষেত্রে গরম থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং তাপসহনশীল নগর পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। কারণ, তাপঝড় কেবল আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও ক্রমবর্ধমান হুমকি।
আরও পড়ুন: জার্মান ভাইস মিনিস্টার ড. বারবেল কোফলারের আবুল খায়ের স্টীল মেল্টিং লিমিটেড পরিদর্শন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন