০৫:৪৮ পি.এম
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট পাকিস্তানে তার প্রথম সফরকালে রাজধানী ইসলামাবাদে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন। এই সফরকে শুধু কৃতজ্ঞতা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ইরানের নতুন অবস্থান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর এটি পেজেশকিয়ানের প্রথম বিদেশ সফর। এর আগে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠকে চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে ৬০ দিনের একটি রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়।
আরও পড়ুন: স্বর্ণে মোড়ানো ১২৬ কক্ষের রাজপ্রাসাদ, প্রবেশমূল্য লাখ ডলার—ট্রাম্পের বিলাসী অন্দরমহল
সফরের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পেজেশকিয়ান এমন এক সময় ইসলামাবাদ যাচ্ছেন, যখন তার নেতৃত্বাধীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই চুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময়ও।
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক জেসিপিওএ (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন) চুক্তিতে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল। বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ২০১৮ সালে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রেজা খানজাদেহ বলেন, “সমঝোতা স্বাক্ষরের পরপরই পেজেশকিয়ানের ইসলামাবাদ সফর ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তিনি এই ভঙ্গুর চুক্তিকে দেশের অভ্যন্তরে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, আঞ্চলিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে চান।”
তিনি আরও বলেন, “এই সফরের প্রয়োজন পেজেশকিয়ানের পাকিস্তানের চেয়ে বেশি।”
আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, এগিয়ে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টি
ইসলামাবাদে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
সফরে পেজেশকিয়ান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এছাড়া পাকিস্তানের সিনেট চেয়ারম্যান ইউসুফ রাজা গিলানি, জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও ইরানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলেছি : ইশরাক
সংকটের মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছে সম্পর্ক
পেজেশকিয়ানের জন্য এটি পাকিস্তানে দ্বিতীয় সফর। ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধের পরও তিনি প্রথম বিদেশ সফরের জন্য পাকিস্তানকেই বেছে নিয়েছিলেন। তখন তিনি প্রথমে লাহোর এবং পরে ইসলামাবাদ সফর করেছিলেন।
ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে ১২টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। একই সঙ্গে বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ’র ইসলামাবাদ ব্যুরো প্রধান আফজাল রেজা বলেন, “পেজেশকিয়ান পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছেন দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক বাহিনী এবং জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। বিশেষ করে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানাতেই এই সফর।”
আরও পড়ুন: ইনস্টাগ্রামে রিলস দেখলেই বেতন, অদ্ভুত চাকরির বিজ্ঞাপনে নেটদুনিয়ায় ঝড়
তবে দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় এতটা মসৃণ ছিল না। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইরান পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
তেহরানের দাবি ছিল, তারা সশস্ত্র সংগঠন জইশ আল-আদলের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা করেছে।
এর জবাবে পাকিস্তানও ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে হামলা চালায়। কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।
তবে দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান ইসলামাবাদ সফর করে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেন এবং পরে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
আরও পড়ুন: গাজায় ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে শত শত তাঁবু প্লাবিত, দুর্ভোগ চরমে
এর কয়েক মাস পর ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রায়িসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন। পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসেন পেজেশকিয়ান।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা
মার্কিন-ইসরায়েল হামলা শুরুর পর থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে অন্তত সাতবার ফোনালাপ হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব আলোচনার কয়েকটি প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও অন্তত দুইবার তেহরান সফর করেছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও একাধিকবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সফর করেন।
আরও পড়ুন: ইরানকে সহায়তার অভিযোগে কানাডার ৮ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফল হিসেবে ১৮ জুন ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক কমিটি গঠন, পারমাণবিক ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পৃথক কর্মপরিকল্পনা, হরমুজ প্রণালী নিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং লেবানন বিষয়ে সংঘাত এড়ানোর প্রক্রিয়া।
বিশ্লেষক খানজাদেহ বলেন, “বার্গেনস্টক প্রযুক্তিগত আলোচনা আয়োজন করছে, কিন্তু ইসলামাবাদ রাজনৈতিক আস্থা তৈরির জায়গা তৈরি করছে।”
তার মতে, প্রযুক্তিগত আলোচনায় নিয়ম, সময়সূচি ও যাচাই পদ্ধতি নির্ধারণ করা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য প্রয়োজন আস্থা ও নেতৃত্বের সমর্থন।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারই ইরানের বড় লক্ষ্য
ইরানের বিষয়ে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, পেজেশকিয়ানের সফর নিয়ে তিনি আশাবাদী, তবে সতর্কও রয়েছেন।
তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ থেকে দূরে থাকতে ইরান প্রস্তুত এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে কাজ করতে পারে। তবে ইরানের মূল লক্ষ্য হলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
দুররানি বলেন, “ইতোমধ্যে ৬০ দিনের জন্য ইরানকে বিশ্ববাজারে তেল রফতানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি বড় ধরনের স্বস্তি।”
লেবানন ইস্যুতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, ইসরায়েল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা মেনে চলে।
পেজেশকিয়ানের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তাও
বিশ্লেষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের ইসলামাবাদ সফর পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্বও বাড়াবে। ইরান প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে শুধু বার্তাবাহক নয়, বরং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। সেইসাথে সফরটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
খানজাদেহ বলেন, “এই সফরের মাধ্যমে পেজেশকিয়ান দেখাতে চাইছেন যে, কূটনীতি আত্মসমর্পণ নয়। ইরান তার সার্বভৌম অবস্থান থেকে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়।” সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন