মঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০২:৪৪ পি.এম
ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ তার লিগ পর্বের উত্তেজনাপূর্ণ দ্বিতীয় রাউন্ড নিয়ে হাজির হয়েছে। আজ রাত ১টায় মাঠে গড়াতে যাওয়া ম্যাচগুলোতে মহাদেশের নামকরা দলগুলো একে অপরের মুখোমুখি হবে। ইউরোপজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি এখন এই জমজমাট ম্যাচগুলোর দিকে। এই প্রতিবেদনে চ্যাম্পিয়নস লিগের আজকের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হচ্ছে।
আর্সেনাল বনাম লিল
লিগ পর্বের প্রথম ম্যাচে নাপোলিকে পরাজিত করে দারুণভাবে মিশন শুরু করেছে গানাররা। অপরদিকে, ফরাসি ক্লাব লিল রিয়াল বেতিসের কাছে পরাজয়ের পর বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে। মিকেল আর্তেতার শিষ্যরা নিজেদের হোমগ্রাউন্ডে সব সময়ই শক্তিশালী। লন্ডনের এমিরেটস স্টেডিয়ামে বুকায়ো সাকা এবং কাই হাভার্টজদের ফর্ম লিলের ডিফেন্সের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অপ্টা সুপার কম্পিউটারের ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামলেও আর্সেনালের জন্য লিলকে হালকা নেওয়ার সুযোগ নেই।
অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড
প্রথম ম্যাচে লিভারপুলের কাছে পরাজয়ের পর দিয়েগো সিমিওনের অ্যাটলেটিকো দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা চার ম্যাচে জয় পেয়েছে। বিপরীত দিকে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ইউরোপে সাবাহ এফসিকে পরাজিত করলেও প্রিমিয়ার লিগে তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স হতাশাজনক। শেষ চার ম্যাচে তারা জয়হীন। রিয়াদ এয়ার মেট্রোপলিটানোতে মাদ্রিদের রক্ষণাত্মক ও দুর্ভেদ্য দুর্গে রেড ডেভিলসদের জন্য ম্যাচটি হবে একপ্রকার কঠিন পরীক্ষা।
গ্যালাতাসারে বনাম বার্সেলোনা
হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনা বর্তমানে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে। ফেইনুর্ডকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করার পর সব ধরনের টুর্নামেন্টে তাদের জয় সংখ্যা ১০ ম্যাচে পৌঁছেছে। অপরদিকে, তুর্কি জায়ান্ট গ্যালাতাসারে প্রথম ম্যাচে স্পোর্টিং সিপির কাছে পরাজিত হয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। ইস্তানবুলের রামস পার্কে গ্যালাতাসারেকে হারাতে হলে রাফিনহা ও রবার্ট লেভানডোভস্কিদের নিজেদের সেরাটা দিতে হবে, কারণ স্প্যানিশ দলগুলোর বিপক্ষে তাদের অতীত রেকর্ড খুব একটা সুবিধাজনক নয়।
ইন্টার মিলান বনাম ক্লাব ব্রুগ
সান সিরোতে সিরি’এতে পারমা ক্যালসিওকে পরাজিত করে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা ইন্টার মিলান এই ম্যাচে নামছে। ঐতিহ্যবাহী সান সিরোতে ইতালিয়ান ক্লাবটি বরাবরই ফেভারিট। তবে বেলজিয়ান চ্যাম্পিয়ন ক্লাব ব্রুগকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়, কারণ তাদের দ্রুতগতির কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল যেকোনো বড় দলকে বিপদে ফেলতে পারে।
ভাইকিং বনাম বায়ার্ন মিউনিখ
নরওয়ের ক্লাব ভাইকিং এফসির জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারণ তারা প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে লাইস অ্যারেনায় তাদের সামনে রয়েছে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ। হ্যারি কেইন এবং জামাল মুসিয়ালাদের বিধ্বংসী আক্রমণভাগকে রুখতে নরওয়ের তীব্র শীতের আবহাওয়া এবং ঘরের মাঠের সমর্থকদের উন্মাদনা ভাইকিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপিয়ান ফুটবলের এই রোমাঞ্চকর রাতে দর্শকরা যে দারুণ কিছু উপভোগ করতে চলেছেন, তা বলাই বাহুল্য। কে হাসবে শেষ হাসি—তা জানতে চোখ রাখতে হবে ১৪ অক্টোবরের হাইভোল্টেজ এই ম্যাচগুলোতে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল ও গ্যাস স্থাপনায় প্রাণঘাতী হামলার প্রতিক্রিয়া জানাতে গেছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান। তিনি বলেছেন, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলার পর সৌদি আরবের জবাব হবে ‘সমানভাবে কঠোর’।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেসে (ডব্লিউপিসি) প্রিন্স আবদুল আজিজ মন্তব্য করেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের জবাবও সমানভাবে গুরুতর হতে হবে।’
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলায় গত কয়েক দিনে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। রোববার রাজধানী রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর আগের দিন একই বিমানবন্দরের আরেকটি টার্মিনালে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হন। হামলার পর টার্মিনালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হুথিরা দাবি করেছে, পশ্চিম ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি আরবের ‘নিষ্ঠুর আগ্রাসনের’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা এসব হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলসহ বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সরকারপন্থি বাহিনীকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমান সহায়তা প্রদান করছে।
সোমবার রাতে আবারও রিয়াদে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। হুথিদের এক মুখপাত্র দাবি করেন, তাদের বাহিনী আবারও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে কাতার এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, তারা সাময়িকভাবে রিয়াদ ও সৌদি আরবের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখবে। আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে আবুধাবি থেকে রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের ফ্লাইট বাতিলের কথা জানিয়েছে ইতিহাদ এয়ারওয়েজও। বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শনিবার পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাদের বাহিনী সৌদি আরবের একটি নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান, হুথিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া হয়েছিল।
বিমানবন্দরে এক সপ্তাহে চারবার হামলা
রিয়াদের বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের একটি সম্মেলনকেন্দ্রে রোববার বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেস শুরু হয়। গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরটি চারবার হামলার শিকার হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরের একটি স্থাপনা ও মাটিতে থাকা একটি বিমানে দুটি হামলায় তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। তাদের মধ্যে দেশটির রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একজন পাইলট ছিলেন।
শনিবার টার্মিনাল-৩-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরো কয়েকজন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি, একজন মার্কিন নাগরিক, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানীয়, একজন সিরীয়, একজন ফিলিস্তিনি, একজন সুদানি ও একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (জিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, রোববার একটি নিক্ষিপ্ত বস্তু টার্মিনাল-৪-এ আঘাত হানলে পাকিস্তানের এক বাসিন্দা নিহত হন। একই দিন সন্ধ্যায় দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা হয়। তবে সেখানে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, তাদের বাহিনী পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে একটি ড্রোন এবং খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
এদিকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, রোববার রাজধানী সানায় একটি বাড়িতে সৌদি বিমান হামলায় এক শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন।
‘সৌদি আরব নিরাপদ, অতিথিদের সুরক্ষা দেব’
সোমবার বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেসের উদ্বোধনী বক্তব্যে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী হামলার মধ্যেও সম্মেলনে অংশ নেওয়ায় জ্বালানি খাতের নির্বাহী ও নীতিনির্ধারকদের ধন্যবাদ জানান।
প্রিন্স আবদুল আজিজ বলেন, ‘আপনারা জানেন, এই দেশ নিরাপদ। আপনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, জ্বালানির নিরাপত্তাকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সৌদি আরবের অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, জনগণ ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে।
এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সৌদিরা নির্ভীক, লড়াকু ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ। আমরা বিশ্বকে প্রমাণ করব, যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাই না কেন, তা কাটিয়ে উঠব।’
এ বিষয়ে হুথিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে রোববার সন্ধ্যায় এক ভিডিওবার্তায় হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাদের বাহিনী রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দুটি তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তার দাবি, এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদি আরবের ১২৪টি বিমান হামলার জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার জন্য বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের প্রতি আবারও সতর্কতা জানান সারি। তবে মক্কা ও মদিনার ইসলামের পবিত্র দুই শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এ সতর্কতা প্রযোজ্য নয় বলে জানান তিনি।
সারি বলেন, সৌদি আরবের আগ্রাসন বন্ধ এবং ইয়েমেনের জনগণের ওপর অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের বাহিনী সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে হামলা আরো বাড়াবে।
তার ভাষায়, ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ এবং ‘উত্তেজনার জবাবে উত্তেজনা’—এই নীতি অনুসরণ করা হবে। সৌদি আরবের শত্রুপক্ষের রসদ ও জনবল পাঠানোর ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
হামলার নিন্দা জাতিসংঘের, সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প
শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ ঘটনায় ‘গভীরভাবে মর্মাহত’ হওয়ার কথা জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিদের ওপর সৌদি আরবের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান বলেছে, পরিস্থিতির অবনতিতে তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ ইরান বারবার অস্বীকার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সমাধানে দেশটি ‘সংলাপ ও আলোচনার’ আহ্বান জানিয়েছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ থেকে নতুন করে সংঘাত
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে বছর হুথিরা রাজধানী সানা থেকে সরকারকে উৎখাত করে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
চার বছর ধরে চলা একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি গত জুলাইয়ে ভাঙতে শুরু করে। ওই সময় হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সমুদ্র অবরোধ’ ঘোষণা করে। এরপর সৌদি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে তারা।
হুথিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বন্দর ও বিমানবন্দরে সৌদি অবরোধ এবং সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলার জবাবে তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। সানা বিমানবন্দরে হামলার দায় অবশ্য ইয়েমেনের সরকার স্বীকার করেছে।
সরকারের দাবি, অনুমতি ছাড়া একটি ইরানি বিমান যাতে সেখানে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য হামলাটি চালানো হয়েছিল।
গত মাসে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছের কিছু এলাকা থেকে সরকারপন্থি বাহিনীকে সরিয়ে দেয়। প্রণালিটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত।
হুথিরা বলেছে, ওই পথে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য তারা কোনো হুমকি নয়। তবে সৌদি আরবের জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখবে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়াতেও ভূমিকা রেখেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের ওপর বেশি নির্ভর করছিল।
গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সরকার হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। সরকারপন্থী বাহিনীর দাবি, সৌদি আরবের জোরালো বিমান সহায়তায় তারা দ্রুত বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের কিছু এলাকা পুনর্দখল করেছে। তবে হুথিরা কোনো এলাকা হারানোর দাবি অস্বীকার করেছে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য জানান।
জাহেদ উর রহমান উল্লেখ করেন, ‘সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভিভিআইপি মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি হয়েছে কি না, সরকার অবশ্যই তা খতিয়ে দেখবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও বিদেশে হেনস্তার ঘটনার পর থেকে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সে সম্পর্কে আমি অবগত। এ ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতে চাই, তারা যদি এ ধরনের অপচেষ্টা অব্যাহত রাখেন, তবে তা চ্যালেঞ্জহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তাদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ফলে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। হামলায় ওমরাহযাত্রী, বিদেশি কর্মীসহ বহু বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, বিপুল অর্থ ব্যয় করে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুললেও সব ধরনের হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়।
৬ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে সংঘটিত হামলাগুলো সৌদি আরবের বিমান চলাচলকে ব্যাহত করেছে। হামলার ফলে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক মোহাম্মদ ইউসুফ এবং বাংলাদেশের আলেম মুফতি মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা, হুথিদের সামরিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।
সংখ্যার চাপে দুর্বল হতে পারে আকাশ প্রতিরক্ষা। সৌদি আরব প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, একাধিক স্তরের রাডার এবং আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হুথিদের সমন্বিত হামলা এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আক্রমণকারীরা উন্নত প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, নিচু দিয়ে উড়ে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একসঙ্গে অনেক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ করা হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে প্রতিটি হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ ডলার; কিছু সংস্করণের ক্ষেত্রে ব্যয় আরো বেশি হতে পারে। বিপরীতে, একটি সস্তা আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এই বিশাল ব্যয়ের ব্যবধান প্রতিরক্ষাকারী দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, প্রতিটি হামলা ঠেকাতে ব্যয়বহুল প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে আক্রমণকারীর তুলনায় প্রতিরক্ষাকারীকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস এবং মিত্রদের কাছ থেকে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
হামলায় বেসামরিক মানুষ ও ধর্মীয় যাত্রীদের হতাহত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র মক্কা নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করা ওমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়া উচিত নয়।
মিসরের আল-আজহারসহ ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাও (ওআইসি) পবিত্র স্থানগামী যাত্রীদের নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, দুই পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা এবং হজ-ওমরাহযাত্রীদের সুরক্ষা সৌদি আরবের জন্য একটি অতিক্রম-অযোগ্য সীমারেখা।
ধর্মীয় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি কেবল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব নয়; বরং যেসব দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ হজ ও ওমরাহ পালনে যান, সেসব দেশেরও এ বিষয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
‘স্যাক্রেড করিডর’ গঠনের প্রস্তাব
ধর্মীয় যাত্রীদের যাতায়াতের পথকে সামরিক সংঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ‘স্যাক্রেড করিডর’ বা পবিত্র যাত্রাপথের একটি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হবে হজ ও ওমরাহযাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথকে স্থায়ীভাবে সামরিক সংঘাতমুক্ত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আওতায় আনা।
এমন প্রস্তাবটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় যাত্রীদের সুরক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
সৌদির ভিশন ২০৩০-এ নতুন চাপ
হামলার প্রভাব শুধু নিরাপত্তা ও বিমান চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৌদি আরবের অর্থনীতি তেলনির্ভরতা থেকে বের করে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাতে সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশটিকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা। কিন্তু রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে বারবার হামলা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হামলার পর সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার রিয়াদ থেকে নির্ধারিত ফ্লাইটের বড় অংশ বাতিল করতে বাধ্য হয়। ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে যায়। নতুন বিমান সংস্থা রিয়াদ এয়ারের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি এমিরেটস, ইতিহাদ ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার সংযোগ ফ্লাইটেও বিঘ্ন ঘটে।
এ পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন সৌদি আরব আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ উদ্যোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীর সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কোনো দেশের অর্থনৈতিক শক্তি বা বিপুল সার্বভৌম সম্পদ থাকলেই তার অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক দ্বিধা।
নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতিটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেছেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তবে সৌদি আরবের অনুরোধের পরও ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পবিত্র স্থান ও ধর্মীয় যাত্রীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য ইয়েমেনের সংঘাতসহ বৃহত্তর আঞ্চলিক বিরোধগুলোর রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
হুথিদের ইরানের সমর্থনপুষ্ট একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও রয়েছে। ফলে ইরান তাদের সমর্থন দিলেও গোষ্ঠীটির প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত হয়—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে। সেখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে জ্বালানি পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান।
আধুনিক যুদ্ধের ঝুঁকি আর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অপেক্ষাকৃত দুর্বল সামরিক শক্তির কোনো গোষ্ঠীও ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করে একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।
বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং পরিবহনকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অল্প কয়েকটি স্থানে কেন্দ্রীভূত থাকলে সেগুলোর একটিতে হামলার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শুধু উন্নত অস্ত্র বা বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর নির্ভর না করে অবকাঠামোর বিকল্প ব্যবস্থা, দ্রুত পুনরুদ্ধার সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ওমরাহযাত্রীদের হতাহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—ধর্মীয় যাত্রী ও নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে সামরিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে রাখা যায়? এর উত্তর খুঁজতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সংঘাত প্রশমন এবং কার্যকর আইনি সুরক্ষা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, প্রযুক্তি ও অর্থ দিয়ে নিরাপত্তার কিছু অংশ নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সমাধান ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অপরিহার্য।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, আল-জাজিরা ও রয়টার্স
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
গাজায় শীতের আগমনে নতুন মানবিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ঘরবাড়ি হারানো ফিলিস্তিনিরা একদিকে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁবুতে আশ্রয় নিলে বৃষ্টি, বন্যা ও তীব্র ঠান্ডার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে হাজারো পরিবারের জীবন এখন দুই ধরনের বিপদের মধ্যে আটকে গেছে।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে এখনো বহু বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন। ভবনের দেয়াল ও ছাদ থেকে প্রায়ই কংক্রিটের টুকরো খসে পড়ছে। তবুও আসন্ন শীতের ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পরিবারগুলো এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে।
কিন্তু এসব ভবনে থাকলেও বিপদ কাটছে না। ছাদ ও দেয়ালের ফাটল দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে অস্থায়ী বসবাসের জায়গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। বাসিন্দারা প্লাস্টিক ও কাপড়ের টুকরো দিয়ে ফাটল বন্ধ করে ঠান্ডা বাতাস ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি পানি সংগ্রহ করতে যাওয়ার সময়ও তাঁদের ধসে পড়ার আশঙ্কায় থাকা দেয়াল ও ভবনের নিচ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
‘আমাদের আর কোনো উপায় নেই’
গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তুচ্যুত মাহের আওয়াদ খাদের। তিনি জানান, সেখানে বসবাস করার সময় প্রায়ই তাদের ওপর পাথর ও কংক্রিটের টুকরো পড়ে। পানি আনতে গেলেও বিপদের মুখে পড়তে হয়।
মাহের সেখানে প্রায় চার-পাঁচ মাস ধরে অবস্থান করছেন। তাঁর কোনো চাকরি বা আয়ের উৎস নেই। পরিবারের জন্য বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই। তিনি অভিযোগ করেন, এখন পর্যন্ত কোনো মানবিক সহায়তাকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়ায়নি।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতিগ্রস্ত আরেকটি ভবনের নিচে পরিবার নিয়ে থাকছেন তাহের হাজ্জো। আগের শীতেও ভবনটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছিল। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও থেকে কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ খসে পড়ত।
আসন্ন শীতের কথা মাথায় রেখে তিনি এখন সন্তানদের সুরক্ষায় আশপাশের জায়গা বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে শক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে এতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মিলছে না। ভবনের ছাদ যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে কীভাবে দিন কাটছে, জানতে চাইলে তাহেরের উত্তর, তাদের কিছুই করার নেই।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রাণহানির আশঙ্কা
গাজায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাসের বিপদ এরই মধ্যে প্রাণহানির ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত মাসে গাজা সিটির সাবরা এলাকায় আল-সাআদা আবাসিক ভবন ধসে ২১ জন নিহত হন। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এর কয়েক দিন পর একই এলাকায় আরেকটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনও ধসে পড়ে।
এসব ঘটনায় যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে আশ্রয় নেওয়া হাজারো মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গাজার গণপূর্ত ও আবাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পুরো গাজা উপত্যকায় প্রায় ৩ হাজার ভবনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেক পরিবার সেগুলোতেই অবস্থান করছে।
শীতকালে ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও প্রতিকূল আবহাওয়া ভবনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া দেয়াল ও ছাদ ধসে পড়ার আশঙ্কা আরও বাড়বে।
জরুরি সহায়তা চেয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। গাজা সিটির কর্মকর্তারা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসরত মানুষদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর জরুরি সহায়তা চেয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, শীতের প্রতিকূল আবহাওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো মেরামত, শক্তিশালী করা কিংবা বিপজ্জনক স্থাপনাগুলো থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রী তাদের হাতে নেই।
এদিকে, ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি, উদ্ধারযান ও কংক্রিট কাটার সরঞ্জাম প্রবেশেরও আহ্বান জানিয়েছে গাজার সিভিল ডিফেন্স। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য অস্থায়ী প্রস্তুতকৃত আবাসন ও জরুরি আশ্রয় উপকরণ সরবরাহের দাবিও উঠেছে। তবে এসব সহায়তার উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত মাহের ও তাহেরের মতো হাজারো পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আজ রাতে তারা কোথায় নিরাপদে ঘুমাবেন?
যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো এসব মানুষের জন্য বাস্তুচ্যুতি এখন শুধু নতুন করে বোমা হামলা বা উচ্ছেদের আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং মাথার ওপর থাকা ছাদটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়বে কি না, সেই আতঙ্কও তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ