১১:২২ এম
আজ সোমবার শুরু হচ্ছে ফিলিপাইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে আনা অভিশংসনের অভিযোগের বিচার। এর জন্য দেশটির সিনেট অভিশংসন আদালত হিসেবে বসবে।
প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সঙ্গে সারা দুতের্তের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে এই বিচার শুরু হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিচার দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিচার শুরু করার আগে রাজধানী ম্যানিলায় সিনেট ভবন ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে ছয় হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধিতে সীমিত পরিসরের বাজেটের পথে যুক্তরাজ্য
এদের মধ্যে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, বিচার শুরুর দিনে সারা দুতের্তের সমর্থক এবং বিরোধী, উভয় পক্ষেরই বিক্ষোভ হতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিচার শুরুর দিনে সারা দুতের্তে বা তার আইনজীবীরা আদালতে হাজির থাকতে পারবেন। পুরো বিচার প্রক্রিয়া ৯২ দিন ধরে চলার কথা রয়েছে।
সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তবে তিনি স্থায়ীভাবে সরকারি যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে যেতে পারেন। এর ফলে ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ওই নির্বাচনেই প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের ছয় বছরের মেয়াদ শেষ হবে। ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অজানা উৎস থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি, গোপন রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া কিছু অভিযোগ রয়েছে যেখানে প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট মার্কোসকে হত্যার হুমকি দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে। তবে সারা দুতের্তে এই সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিচার শুরুর আগে তিনি এই অভিযোগগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে দিতে রাজি হননি। তার সমর্থকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট মার্কোস এবং তার রাজনৈতিক মিত্ররা পরিকল্পিতভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তার ঘনিষ্ঠ সিনেট সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।
ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এবং সারা দুতের্তে ২০২২ সালের নির্বাচনে একই জোট থেকে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। সেই সময় ফিলিপাইনে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক পরিবারের সমর্থন একত্রিতকারী এই জোট গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, এবং দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। সারা দুতের্তে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তের মেয়ে। রদ্রিগো দুতের্তে গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নির্দেশে গ্রেপ্তার হন। পরে তাকে নেদারল্যান্ডসের হেগে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই আটক রয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিচার আগামী ৩০ নভেম্বর শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঘোষণা দিয়েও নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে পারল না সৌদি এয়ারলাইন্স
রদ্রিগো দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল ভিত্তি তার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযান। এই অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন দরিদ্র এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল, পশ্চিমা দেশ এবং বিভিন্ন মানবাধিকারের সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। যদিও রদ্রিগো দুতের্তে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সারা দুতের্তের অভিযোগ, তার ৮১ বছর বয়সী বাবাকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে প্রেসিডেন্ট মার্কোসের ভূমিকা রয়েছে। দুই পরিবারের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পার্থক্যও লক্ষ্য করা গেছে। প্রেসিডেন্ট মার্কোস ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করেছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বাড়তে থাকা তৎপরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তার সরকার।
তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করারও হুমকি দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের উপকূলরক্ষী বাহিনী ফিলিপাইনের নৌবাহিনী ও জেলেদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জলকামান ব্যবহার করছে, তবে সারা দুতের্তে প্রকাশ্যে এটার নিন্দা করেননি। এজন্য তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। গত মাসে ফিলিপাইনের প্রতিনিধি পরিষদে বিপুল ভোটে সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্ট মার্কোসের সমর্থকদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সারা দুতের্তেকে দোষী সাব্যস্ত করতে ২৪ সদস্যের সিনেটে অন্তত ১৬ জন সিনেটরের সমর্থন লাগবে। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেলেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন এবং সরকারি পদে থাকার অধিকার হারাবেন।
বিচার শুরুর আগেই দুতের্তে-সমর্থক কয়েকজন সিনেটর আইনী সমস্যায় পড়েছেন। দুতের্তে-ঘনিষ্ঠ সিনেটর জিংগয় এস্ট্রাডাকে গত মাসে একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য দুর্নীতির মামলা করা হয়েছে। তবে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দুতের্তে-সমর্থক আরেক সিনেটর রোদান্তে মারকোলেতার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের নির্বাচনী অনুদান গ্রহণ এবং সম্পদের ঘোষণায় সেই অর্থ গোপন করার অভিযোগ রয়েছে। তিনিও কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া সাবেক জাতীয় পুলিশপ্রধান ও বর্তমান সিনেটর রোনাল্ড দেলা রোসা আত্মগোপনে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রদ্রিগো দুতের্তের আমলের হত্যাকাণ্ডে সহঅভিযুক্ত হিসেবে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। দুতের্তের মাদকবিরোধী অভিযান বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আরও পড়ুন: সরকারের সমালোচনা করলেই গ্রেপ্তার মানবাধিকারের লঙ্ঘন: আখতার হোসেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন