০৪:২৪ পি.এম
ঢাকা, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ : কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই সপ্তাহে মন্ট্রিয়লে অনুষ্ঠিতব্য একটি শীর্ষ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত নতুন অংশীদারিত্বের ভিত্তি স্থাপন করবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে।
ব্রাসেলস থেকে এএফপি জানায়, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে সহযোগিতা চালিয়ে আসা ব্রাসেলস ও অটোয়া এবার আরও কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের সম্পর্ককে গভীর করতে চায়।
সম্মেলনে আলোচনার টেবিলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো:
আরও পড়ুন: স্পেনে ২ ট্রেনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৫০ জনে পৌঁছেছে
সহযোগী সদস্যপদ
গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন কানাডাকে ২৭ সদস্যের ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছিলেন।
এ প্রস্তাবটি কিছুটা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে, কারণ ইইউর চুক্তিগুলোতে ‘সহযোগী সদস্য’ নামে কোনো মর্যাদার অস্তিত্ব নেই। এর অর্থ ও পরিধি যথাযথভাবে নির্ধারণের আগে এ শব্দ ব্যবহার না করার পক্ষে ইইউর কয়েকটি সদস্যদেশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইউর এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, বিষয়টি জোটটির জন্য ‘সম্পূর্ণ নতুন ক্ষেত্র’। তবে তাঁর মতে, সদস্যপদ না দিয়েও কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার উচ্চাকাক্সক্ষারই প্রতিফলন এ ধারণা।
আরও পড়ুন: ইরান: হামলা হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিপর্যয়ের আশঙ্কা
এ ধরনের অংশীদারিত্বের আওতায় জলবায়ু, জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে নীতিগত সমন্বয়, ইইউর কিছু কর্মসূচিতে কানাডার অংশগ্রহণ এবং একটি অভিন্ন শাসন কাঠামো গড়ে তোলার বিষয় থাকতে পারে।
ইইউর আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ববিষয়ক কমিশনার জোজেফ সিকেলা গত সপ্তাহে ইউরোপীয় পার্লামেন্টকে জানান, প্রস্তাবিত শাসন কাঠামোটি কানাডাকে সম্প্রতি ইইউর শীর্ষ সম্মেলন ও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য দেওয়া আমন্ত্রণের ভিত্তিতে আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
ইইউর কয়েকজন আইনপ্রণেতা নিয়মিত মতবিনিময়ের জন্য একটি আন্তঃসংসদীয় সংস্থা গঠনের পক্ষেও মত দিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ
আরও পড়ুন: কুয়েতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে তিনজনের মৃত্যুদণ্ড
কানাডায় প্রচুর বিরল মৃত্তিকা উপাদান ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে, যা ব্যাটারি ও বায়ুকলসহ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি তৈরিতে প্রয়োজন। বর্তমানে ইউরোপ এসব খনিজের বড় অংশ চীন থেকে সংগ্রহ করে।
তবে কানাডায় খনিজ উত্তোলন খাত এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত হয়নি। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক নোয়া গর্ডন বলেন, বেইজিং-প্রভাবিত বাজারে প্রবেশের আগে খনি পরিচালনাকারীরা বিনিয়োগ এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি চাইছেন।
সম্মেলনের মাধ্যমে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টিতে একটি চুক্তি হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইউ কর্মকর্তা জানান, দুই পক্ষ যৌথভাবে খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের মজুত গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং চাহিদা পূরণে সহায়তার জন্য এসব উপকরণ সংরক্ষণ করা হবে।
আরও পড়ুন: এশিয়ান গেমসের স্বর্ণজয়ী অ্যাথলেট নীরাজ যাদবের রহস্যজনক মৃত্যু
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও মহাকাশ
মন্ট্রিয়ল সম্মেলনে দ্রুততর ও কম খরচে অনলাইন লেনদেনের সুযোগ বাড়াতে একটি ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করা হতে পারে।
সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত করা যৌথ বিবৃতির একটি প্রাথমিক খসড়া এএফপির হাতে এসেছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো ও এআই-সংক্রান্ত বিধিবিধানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।
সম্মেলনে ইইউর গ্যালিলিও কর্মসূচি এবং আইআরআইএসক্ষ্ম প্রকল্পে কানাডার অংশগ্রহণের পথ তৈরি করতে কাজ শুরুর কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ আফ্রিকায় গ্যাস সংকটে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দরপত্র বাতিল
গ্যালিলিও হলো একটি বৈশ্বিক নেভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা, যা যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) বিকল্প হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, আইআরআইএসক্ষ্ম প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের বিকল্প হিসেবে ইউরোপের নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সম্প্রতি ইইউ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে যুক্ত করার পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে। এ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে যোগাযোগ সংযোগ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
এক ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘আমাদের নিজেদের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং নিজেদের প্রয়োজনের দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে।’
জনগণের মধ্যে যোগাযোগ
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহু ও গাদি আইজেনকোটের ৫টি জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে একমত
কানাডাকে ইইউর জনপ্রিয় ‘ইরাসমাস’ যুব বিনিময় কর্মসূচিতে যুক্ত করার বিষয়েও অটোয়া ও ব্রাসেলসের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদেশে এক সেমিস্টারসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও বিনিময় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন।
যৌথ বিবৃতির খসড়ায় শ্রমিকদের চলাচলের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চলাচলে বাধা কমানো এবং পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জার্মানির মধ্য-বামপন্থী ইইউ আইনপ্রণেতা টোবিয়াস ক্রেমার বলেন, ‘চুক্তি ও প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইইউ-কানাডা জোটের প্রকৃত ভিত্তি হলো মানুষে-মানুষে যোগাযোগ।’
ইউক্রেনসহ অন্যান্য সহযোগিতা
ইউক্রেনের বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দিতে কানাডাকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে ইইউ। একই সঙ্গে কানাডাকে ইউরোপের গবেষণা অর্থায়নের প্রধান কর্মসূচি ‘হরাইজন ইউরোপ’-এ যুক্ত করার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ইইউর ওই কর্মকর্তা বলেন, কানাডার গবেষকদের জন্য ইউরোপের সুপারকম্পিউটিং অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে জোটটি।
জ্বালানি খাতেও সম্পর্ক জোরদার করতে চায় দুই পক্ষ। যৌথ বিবৃতির খসড়ায় কানাডা থেকে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে কানাডার প্রতিষ্ঠান ডি হ্যাভিল্যান্ডের তৈরি ৫০টি অগ্নিনির্বাপক উড়োজাহাজ যৌথভাবে কেনার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সম্মেলনের প্রাথমিক খসড়ায় এ প্রস্তাবও ছিল।
ইইউর সংকট ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিশনার হাজা লাহবিব এএফপিকে বলেন, জোটটি ২০২৪ সালেই এ ধরনের ২৪টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দিয়েছে। সদস্যদেশগুলো ইইউর পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি বাজেট নিয়ে আলোচনা করায় নতুন করে উড়োজাহাজ কেনার সুযোগ নেই।
ইউরোপের কয়েকটি দেশ এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল। তাদের মতে, ইইউর অর্থ কানাডার তৈরি উড়োজাহাজ কেনার পরিবর্তে ইউরোপীয় নির্মাতাদের তৈরি বিকল্প উড়োজাহাজ কেনার কাজে ব্যয় করা উচিত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন