০৯:৪৮ পি.এম
ইয়েমেনের বাইরে সংঘাতের পরিধি বৃদ্ধি করে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে একাধিক স্থল অভিযান পরিচালনা করেছে হুথিরা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিভিন্ন চৌকিতে এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম ও পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় ছোট আকারে এসব অভিযান চালাচ্ছে হুথিরা। গত অক্টোবরের শেষের দিকে অন্তত একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই অভিযান নজরদারি সরঞ্জামের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তার মতে, হুথিরা অভিযান চালিয়ে সৌদি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যবহৃত কিছু হালকা আগ্নেয়াস্ত্র নিজেদের দখলে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অস্ত্র সাধারণত সৌদি সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্ক টাইমস: ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযান এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তবে যদি তথ্যগুলো সত্য হয়, তাহলে ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের স্থলপথে অনুপ্রবেশ ও হামলার এটি হবে প্রথম ঘটনা।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী শহর ও সামরিক ঘাঁটিতে হুতিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা নিয়মিত ঘটত। সে সময় ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বিভিন্ন স্থানে স্থল অভিযানও চালিয়েছিল।
ধাপে ধাপে বাড়ছে হামলার পরিধি
ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বাশা রিপোর্ট রিস্ক অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশা জানিয়েছেন, তিনি সৌদি সীমান্তে হুতিদের সামরিক তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার মতে, হামলার পরিধি ও তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়াচ্ছে গোষ্ঠীটি।
আরও পড়ুন: চিনা স্যাটেলাইটে ধরা পড়লো ইরান ঘিরে ৩ মার্কিন রণতরী
আল-বাশা বলেন, প্রথম পর্যায়ে দূরপাল্লার ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে যুক্ত হয়েছে মর্টার নিক্ষেপে সক্ষম ছোট কোয়াডকপ্টার ড্রোন এবং স্নাইপারদের অভিযান।
তার ধারণা, স্থলপথে হামলায় ফিরে আসা হুথিদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রাথমিক অভিযানগুলো ইয়েমেন যুদ্ধের শুরুর দিকের কৌশলের মতো হতে পারে। সে সময় হুতিযোদ্ধারা আকস্মিক হামলা চালিয়ে জোটের সদস্যদের আটক, অস্ত্র দখল এবং সামরিক যান ও সরঞ্জাম ধ্বংস করে দ্রুত সরে পড়ত। আল-বাশা যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সহযোগী ফেলো হিসেবেও কাজ করছেন।
সৌদি সীমান্তে সামরিক সহায়তা বাড়াতে পারে মিত্ররা।
হুতিদের নতুন করে সীমান্ত অভিযান সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহায়তা সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছেন এক আরব কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন: ব্রিটিশদের ৭৪ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি মনে করেন
সৌদি আরবের সঙ্গে মক্কা চুক্তির মিত্র তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে দেশটিতে সামরিক সদস্য এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। গত সপ্তাহে মিসরের পার্লামেন্টও সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক বাহিনী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে।
এদিকে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি শনিবার জানিয়েছেন, দামেস্কও এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। পশ্চিমা ওই কর্মকর্তার দাবি, সৌদি সমর্থিত বাহিনীকে সহায়তা করতে সিরিয়ার কয়েকজন ড্রোন বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যে ইয়েমেনে পৌঁছেছেন।
ইয়েমেনের ভেতরেও অগ্রসর হচ্ছে হুথিরা
সৌদি সীমান্তে অভিযান চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে হুথিরা। দেশটিতে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী তাদের অভিযান ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মিশিগানে এল-সায়েদের জয়ে উচ্ছ্বসিত আরব-আমেরিকানরা, অনুভূতি প্রকাশ করলেন ইয়াসমিন আল-সাইয়েদ
সোমবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের রাজধানী হিসেবে পরিচিত এডেন বন্দরের ৫০ মাইলের মধ্যে পৌঁছে গেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজও ঘিরে রেখেছে তারা।
এর আগে সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে শত শত বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাও রয়েছে। হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে রিয়াদকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনও বাতিল করতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি সীমান্তে সাম্প্রতিক স্থল অভিযান দেশটির প্রত্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। বিস্তীর্ণ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে কতটা কঠিন, এসব ঘটনা তা আবারো স্পষ্ট করেছে।
সৌদি ভূখণ্ড নিয়ে হুতিদের পুরোনো দাবি
আরও পড়ুন: অনুপ্রবেশকারীর গল্প সাজিয়ে মুসলিমদের নিশানা করছে সরকার: ওয়াইসি
সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে হুতিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে বলেও দেশটির মধ্যে উদ্বেগ আছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে পরিচালিত হুতি প্রশাসন মূলত দেশটির অভ্যন্তরেই সামরিক কার্যক্রম চালালেও সৌদি আরবের কয়েকটি ভূখণ্ড নিয়ে তাদের ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের আসির, জাজান ও নাজরান প্রদেশ নিয়ে ইয়েমেনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। ১৯৩৪ সালের তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে এসব অঞ্চল সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
সৌদি সীমান্তের দক্ষিণে ইয়েমেনের সাদা প্রদেশের পার্বত্য এলাকায় হুতি আন্দোলনের উৎপত্তি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে। আন্দোলনটি শিয়া ইসলামের জায়েদি মতাদর্শ অনুসরণ করে। ইয়েমেনের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিজেদের দলে যুক্ত করলেও সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের হাশেমি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে। এর মাধ্যমে তারা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের দাবি তুলে ধরে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
আরও পড়ুন: ৮ কোটি মিসরীয় থাকতে কেন ভারতীয়কে বিয়ে করলেন আল-সায়েদ
এআরবি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন