১১:৩৮ পি.এম
বিদায় হলেই বেদনা থাকে, তবে কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে চিরস্মরণীয়। দীর্ঘ ৩৮ বছরের চাকরি জীবনের পর, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহাবুদ্দিন তালুকদার এমনই এক বিদায়ী সংবর্ধনা লাভ করেছেন।
এই প্রধান শিক্ষকের অবসরগ্রহণ উপলক্ষে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি বর্ণিল আয়োজন করে। বিভিন্ন ফুলের মালা দিয়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে করে তাঁর বিদায় জানান সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং স্থানীয়দের ভালোবাসায় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক তাঁর শেষ কর্মদিবসে অবসরে যান। এ দৃশ্য সবার হৃদয় ছুঁয়েছে।
আরও পড়ুন: পুলিশ: ঢাল-লাঠি দিয়ে প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জনকে হত্যা
জানা গেছে, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার। তিনি দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই ছাত্রদের মধ্যে কেউ এখন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কেউ জনপ্রতিনিধি, আবার কেউবা দেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। এর ফলে, প্রিয় শিক্ষকের চাকরি জীবনের শেষ কর্মদিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে তারা ভোলেননি। এই বিশেষ দিনটি স্মরণীয় করে রেখেছেন তার সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে শিক্ষক মো. সাহাবুদ্দিনকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি শ্রেণি থেকে তাকে একটি করে ক্রেস্ট তুলে দেন। এ সময় বিদ্যালয়ের স্কাউট সদস্যরা তাঁকে স্কাউট সালাম দেয়। ঘোড়ার গাড়ির সামনে ও পেছনে মোটরসাইকেলে শিক্ষকরা ছিলেন। গাড়িতে ওঠার সময় বিদায়ী প্রধান শিক্ষককে ফুল ছিটিয়ে এবং ফুলের মালা পরিয়ে বিদায় জানানো হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আয়োজনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষক সাহাবুদ্দিন তালুকদার।
মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার ১৯৮৮ সালের ২১ আগস্ট কার্তিকপুর উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) হিসেবে যোগদান করেন। পরে ২০১৯ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন।
বিদায়ের মুহূর্তে মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, "৩৮ বছর পর অবসরে যাচ্ছি। এই সময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করানোসহ বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। জানি আমার ছাত্ররা আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করেছে, তারা আমাকে কতটা ভালোবাসে। আজ আমার শিক্ষকতা জীবনকে সার্থক মনে হচ্ছে।"
আরও পড়ুন: কোনাবাড়িতে পানি ফ্যাক্টরি ও ঝুট গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
স্থানীয়রা জানান, তার নিরলস প্রচেষ্টার ফলে এলাকায় শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। স্যারের সৎ উপদেশগুলো আমাদের অনেকের জীবনে পরিবর্তন আনিয়েছে। শিক্ষার মান আমাদের বিদ্যালয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। যদি আমরা আরও কিছুদিন তাকে পেতাম, তাহলে হয়তো এই স্কুলটিকে বাংলাদেশের আরও সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছে দিতে পারতাম।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, সাহাবুদ্দিন স্যার ছিলেন ছাত্র ও সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তার ন্যায়নীতি ও আদর্শ আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রহমান মোল্লা ও সোহেল চৌধুরী জানান, স্যার অনেক ভালো ও উদার মনের মানুষ। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি বেশ প্রিয় ছিলেন। কখনো রাগ বা ক্ষোভ দেখাননি। বাবার মতো শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। আমাদের কর্মজীবনে এমন শিক্ষক পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি। তিনি এত উদার মনের মানুষ, কোনো শিক্ষকের বিপদ হলে সঙ্গে সঙ্গে যেতেন এবং খোঁজ খবর নিতেন। অবসরজনিত কারণে তিনি বিদায় নিয়েছেন। এটি সবাইকে মানতেই হবে। আমরা তার দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছি।
অনুষ্ঠান শেষে আবেগপূর্ণ পরিবেশে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন সাহাবুদ্দিন তালুকদার। উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী দাঁড়িয়ে বিদায় জানান তাদের প্রিয় শিক্ষককে।
আরও পড়ুন: বরিশালে সন্তানদের ফ্ল্যাটে ঠাঁই হয়নি, ভাড়া বাসায় মিলল বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন