১২:৩৬ পি.এম
সুনামগঞ্জ, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ : শান্তি ও সম্প্রীতির জেলা সুনামগঞ্জ। এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও মৎস্যের ওপর নির্ভরশীল। আবার কিছু কিছু অঞ্চলে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি।
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসছে। ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও প্রতিমার গায়ে শেষ তুলির আঁচড় দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে মণ্ডপ সাজানোর কাজ। বাঁশ, খড়, মাটি ও রঙের সঙ্গে যোগ হয়েছে আলোর ঝলক। ঢাকিরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কয়েক দিনের অপেক্ষার পর হাওরপাড়ের জনপদ সুনামগঞ্জ জেলায় শুরু হতে যাচ্ছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। শরতের এ সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে জেলার প্রতিটি ঘরে চলছে আনন্দের আমেজ।
সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় এবারে ৪৪৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পূজাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারগুলোতেও বেড়েছে ব্যস্ততা।
আরও পড়ুন: পূজার শান্তিপূর্ণ উদযাপনে বিজিবি পাশে থাকবে: কর্নেল তৌহিদ হাসান
আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়া দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী দিয়ে শুরু হবে মূল পূজার আয়োজন। ১৭ অক্টোবর সপ্তমী, ১৯ অক্টোবর অষ্টমী, ২০ অক্টোবর নবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজা শেষ হবে।
পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রতিমায় শেষ তুলির আঁচড়ে ব্যস্ত হয়ে উঠছেন প্রতিমাশিল্পীরা। অনেক মণ্ডপে কাঠামো তৈরি, খড় বাঁধা ও মাটির প্রলেপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে প্রতিমার রং, অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ। দেবীর মুখাবয়ব ফুটিয়ে তুলতেও চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। শুধু প্রতিমাশিল্পীরাই নন, পূজাকে ঘিরে কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছেন মণ্ডপে-সজ্জার কর্মী, আলোকসজ্জাকারী, ঢাকি, ফুল ব্যবসায়ী ও পোশাকের দোকানিরা।
বিভিন্ন এলাকায় পূজাকে কেন্দ্র করে কেনাকাটাও বাড়ছে। হাওরপাড়ের এ জনপদে দুর্গাপূজা শুধুমাত্র ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় মানুষের মিলন ও সম্প্রীতির একটি বড় উপলক্ষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে মণ্ডপে মণ্ডপে জড়ো হন।
সুনামগঞ্জে ৪৪৪টি মণ্ডপে পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক দল ও নৈশপ্রহরীর ব্যবস্থা, সিসিটিভি স্থাপন এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্পে শারদীয় দুর্গাপূজায় ৩০ কোটি টাকার বাণিজ্য সম্ভাবনা
পুলিশ জানিয়েছে, পূজার সময় সাধারণ পোশাকের পুলিশ, মোবাইল ফোর্স, স্ট্রাইকিং ফোর্স ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি জনসমাগম হয় এমন মণ্ডপগুলোতে থাকবে বিশেষ নজরদারি।
আয়োজকদেরও মণ্ডপে সিসিটিভি সচল রাখা, পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং কোনো ধরনের সন্দেহজনক ঘটনা চোখে পড়লে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাওর, নদী ও সীমান্তঘেঁষা জনপদ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জেও উৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
অপেক্ষা এখন ঢাকের প্রথম বোলের :
মণ্ডপে মণ্ডপে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় পড়ছে শেষ তুলির আঁচড়, কোথাও চলছে আলোকসজ্জার পরীক্ষা। আয়োজকেরা ব্যস্ত মণ্ডপে শেষ কাজ নিয়ে, স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রস্তুত হচ্ছেন দায়িত্ব পালনে।
আরও পড়ুন: সুনামগঞ্জে লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে স্মরণানুষ্ঠান ও শোভাযাত্রা
মহালয়ার মধ্য দিয়ে যে অপেক্ষার শুরু, মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক রূপ মিলবে। এরপর ঢাকের বোল, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও আরাধনায় মুখর হয়ে উঠবে সুনামগঞ্জের ৪৪৪টি পূজামণ্ডপ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠুক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও নিরাপদ মিলনের উৎসব এমন প্রত্যাশা করছেন হাওরপাড়ের মানুষ।
প্রতিমা শিল্পী সুরেষ দাস বলেন "৪০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছি এই নিয়েই আমরা সন্তুষ্ট।"
জেলা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক সদস্য অশোক তালুকদার, জেলা কল্যাণ ফ্রন্টের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শংকর কুমার দাস, জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক অজিত দাস, সদস্য সচিব রাজন তালুকদার, যুগ্ম আহ্বায়ক রামকৃষ্ণ তালুকদার সবুজ ও সদস্য বিষ্ণু পদ সরকারসহ নেতৃবৃন্দ জানান, চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলা শহরসহ ১২টি উপজেলায় ৪৪৪ টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করবেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বাসসকে জানান, জেলার প্রতিটি উপজেলায় যাতে শারদীয় উৎসব সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে পালিত হয়, সেজন্য আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল দল-মত এর মানুষদের নিয়ে সভা করেছি। কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকবে।
আরও পড়ুন: দিরাইয়ের পূর্বাঞ্চলে চ্যাপ্টিয়ার হাওরের পানি কমে বিপাকে যাত্রী ও কৃষক, দুশ্চিন্তায় বোরো চাষিরা
জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বাসসকে বলেন, সুনামগঞ্জ সম্প্রীতির জেলা। এখানে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রয়েছে, তা অনন্য। শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপন করতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজান ও নামাজের সময় পূজার সময় মাইক বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন