১১:২৯ এম
আজ ১৪ অক্টোবর, পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে সাতটি মামলার রায়ে ২৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তবে, এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। বর্তমানে বিচারাধীন ৭০টি মামলায় আসামি ৪৮৮ জন। প্রসিকিউশনে জমা পড়েছে প্রায় ৬০০টি অভিযোগ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, একই বছরের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং বিগত বছরগুলোর গুম-খুনের অভিযোগের বিচার শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর সাতটি মামলার রায়ে মোট ৬৮ জন দণ্ডিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন এবং ৩৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের সূত্রে জানা গেছে, একজনকে ক্ষমা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাঁশপাতার চায়ের উদ্ভাবনী ধারণায় দেশসেরা বেরোবির মাহিদ-আজিজ, পাচ্ছেন লাখ টাকার ফান্ড
সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের একটি মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। দণ্ডিতদের মধ্যে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং পুলিশের কয়েকজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬৮ জন দণ্ডিতের মধ্যে ৪৭ জন পলাতক রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ জনের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র চারজন। বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং চূড়ান্ত সাজা কার্যকর করা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামীম বলেন, "বিচার শেষে রায় ঘোষণা ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব। আপিল হলে তা নিষ্পত্তি করে উচ্চ আদালত। চূড়ান্ত সাজা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্তৃপক্ষের।" তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের দুই বছরের কার্যক্রমে তাঁরা সন্তুষ্ট এবং সরকার বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আইনে আপিল নিষ্পত্তির জন্য ৬০ দিনের বিধান রয়েছে। তবে মামলার চাপের কারণে নির্ধারিত সময়ে সব আপিল নিষ্পত্তি করা কঠিন হচ্ছে। আপিলসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না।
আরও পড়ুন: এমপি আব্দুল আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, ক্ষোভ বৃদ্ধি
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, "ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করছে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সহযোগিতায় আইনি উদ্যোগ চলছে।"
বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১-এ ৪৩টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ ২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় মূল ও বিবিধ অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ২০০৯ সাল থেকে সংঘটিত গুম-খুনের অভিযোগও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। নতুন অভিযোগের তদন্ত, অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণের চাপ বাড়ছে। জনবলসংকট এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারে কাজ করছে। ওই ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় আসে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। পরবর্তী সময়ে আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বর্তমান ট্রাইব্যুনালে অপরাধের ধরন ও আসামির ভূমিকা বিবেচনায় বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামীম। চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার মামলায় কনস্টেবল সুজন হোসেনের সাজা বাড়াতে আপিল করেছে প্রসিকিউশন। কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাজা বাড়ানোর আবেদনও করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢামেকে আনা হলো আনিসুল, পলক ও মামুন
বিচারকাজের গতি নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শাফিক উদ্দিন আহনাফের মা সাফাত সিদ্দিকী পারভীন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন আহনাফ। তাঁর মা বলেন, "পরিবার ছেলের হত্যার বিচার দেখতে চায়।" তিনি অভিযোগ করেছেন, বিলম্বের কারণে বিচারপ্রক্রিয়া প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। আহনাফ হত্যা মামলাটি এখনো অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেছেন, "অপরাধ প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিচার ও সাজা কার্যকর দেখতে চান।" একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন