০৩:৫৯ পি.এম
কুয়েতে অবৈধভাবে আবাসিক ভিসা কেনাবেচা, সরকারি নথি জালিয়াতি ও ঘুসের ঘটনায় দেশটির ফৌজদারি আদালত দুই মিশরীয় নাগরিককে পাঁচ বছর করে এবং এক বাংলাদেশি প্রবাসীকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। একই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট একটি পরিবহন কোম্পানিকে ২০ হাজার কুয়েতি দিনার জরিমানা এবং কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুয়েতের আবাসন-বিষয়ক তদন্ত বিভাগের অনুসন্ধানের মাধ্যমে একটি কোম্পানির মাধ্যমে অবৈধভাবে আবাসিক পারমিট কেনাবেচা, সরকারি লেনদেনের নথি জালিয়াতি ও ঘুস দেয়ার বিষয়টি উন্মোচিত হয়। আদালতের রায়ে প্রথম মিশরীয় আসামিকে দুজন শ্রমিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার দিনার জরিমানা করা হয়েছে। দ্বিতীয় মিশরীয়কে আবাসিক পারমিট নবায়নের নথি জালিয়াতি ও ঘুসের ঘটনায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ দিনার জরিমানা দেওয়া হয়েছে।
একই মামলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত এক বাংলাদেশিকে ঘুসের ঘটনায় চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ দিনার জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট পরিবহন কোম্পানিকে প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য ১০ হাজার দিনার করে মোট ২০ হাজার দিনার জরিমানা এবং কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আরও পড়ুন: পর্তুগালে নতুন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলা প্রেসক্লাবের মতবিনিময়
কুয়েতে বিদেশিদের আবাসন নিয়ন্ত্রণে ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর নতুন আবাসন আইন অনুমোদিত হয়। এই আইনটি ১৯৫৯ সালের পুরোনো আবাসন আইনকে প্রতিস্থাপন করে। নতুন আইনে আবাসিক অনুমতি নিয়ে প্রতারণা, অবৈধভাবে শ্রমিক নিয়োগ এবং অর্থের বিনিময়ে স্পনসরশিপ বা আবাসনের সুযোগ বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনো স্পন্সর বা নিয়োগকর্তা বিদেশি শ্রমিককে প্রকৃত চাকরি দেওয়ার পরিবর্তে শুধু আবাসিক অনুমতি বা ভিসা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করতে পারেন না। একইভাবে যে প্রতিষ্ঠানের নামে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের বাইরে অনুমোদন ছাড়া অন্যত্র কাজ করানোও আইনবিরোধী।
কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক অনুমতি বাণিজ্য বা এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার কুয়েতি দিনার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ বাড়তে পারে। সরকারি কর্মকর্তা নিজ পদ ব্যবহার করে অপরাধ করলে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে। এ ছাড়া জাল কাগজপত্র তৈরি, সরকারি নথি জালিয়াতি, ঘুস এবং মানবপাচারের উপাদান থাকলে সংশ্লিষ্ট অপরাধের পৃথক আইনেও বিচার হতে পারে। ফলে একটি ভিসা কেনাবেচার ঘটনা একাধিক ফৌজদারি অপরাধে রূপ নিতে পারে। কুয়েতে অনেক প্রবাসী শ্রমিক বৈধ চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়াই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে বিপুল অর্থ দিয়ে ভিসা নেন। কেউ কেউ দেশে জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, আবার কেউ পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে বিদেশে আসেন।
কিন্তু কুয়েতে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, যে প্রতিষ্ঠানের নামে ভিসা দেওয়া হয়েছে সেখানে প্রকৃত চাকরি নেই। অনেক ক্ষেত্রে বেতন, কাজের পরিবেশ কিংবা থাকার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকে না। কেউ অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে বাধ্য হন, আবার কেউ কাজ না পেয়েও স্পন্সরের কাছে নিয়মিত অর্থ দিতে বাধ্য হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শ্রমিক যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি আবাসন আইন লঙ্ঘনের মামলায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরেই মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ফ্লাইট চালু হবে: আরিফুল হক
অপরাধের ধরন ও প্রমাণ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, দালাল, স্পন্সর, কোম্পানির মালিক এবং মধ্যস্থতাকারী—সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে প্রতিটি শ্রমিককে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কেউ প্রতারণার শিকার হলে তার অভিযোগ, ভূমিকা ও প্রমাণ আলাদাভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কুয়েত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কুয়েতের বিভিন্ন নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহন, হাসপাতাল, হোটেল, শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কুয়েত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ দশমিক ৬২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাবে এ পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ৭৬৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কুয়েতের শ্রমবাজার বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু ভিসা বাণিজ্য, জালিয়াতি ও অবৈধ নিয়োগের কারণে শ্রমিকদের কারাদণ্ড, গ্রেপ্তার, কর্মসংস্থান হারানো কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো ঘটনা বাড়লে এর অর্থনৈতিক প্রভাবও পড়তে পারে। কোনো শ্রমিক কারাগারে গেলে বা চাকরি হারালে তার নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানোও বন্ধ হতে পারে। ভিসা কেনার জন্য অনেক শ্রমিক উচ্চ সুদে ঋণ নেন কিংবা জমিজমা বিক্রি করেন। বিদেশে এসে কাজ হারালে বা দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হলে সেই ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভিসা বাণিজ্য এবং জালিয়াতির কারণে পুরো বাংলাদেশি শ্রমিকগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে নতুন শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সুতরাং, ভিসা কেনাবেচা বন্ধ করা কেবল কুয়েতের আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজার, প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
আরও পড়ুন: মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া ১২ দেশে কর্মী পাঠাতে ছাড়পত্র না দেয়ার নির্দেশ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন