১০:৩২ এম
জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দফা দাবি আদায়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এই লক্ষ্যে আজ শনিবার ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে দীর্ঘ লংমার্চের আয়োজন করেছে জোটটি।
লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ সকাল সাতটায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে শুরু হবে। এর পর পর্যায়ক্রমে ছয়টি স্থানে পথসভা ও অনির্ধারিত সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং রাতের শেষ সমাবেশ কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা এসব সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। প্রায় দেড় হাজার গাড়ির বহর ছাড়াও সোয়া চারশ’ কিলোমিটার সড়কজুড়ে নেতাকর্মীদের ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: লাইভে রাশেদ খাঁনের পত্রিকা ছেঁড়ার ঘটনায় মিয়া গোলাম পরওয়ারের মন্তব্য
দেশব্যাপী সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে ৬ দফা দাবিতে প্রথম লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। পরে ৬ দফার সঙ্গে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি যুক্ত হয়ে ৭ দফা হয়ে যায়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে দ্বিতীয় লংমার্চের সময় আঞ্চলিক দাবি হিসেবে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন ইস্যু যুক্ত হয়।
দুটি লংমার্চে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর আজকের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়ার কর্মসূচিকে সফল করার জন্য জামায়াত জোট আরো বেশি তৎপরতা চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আজকের লংমার্চের চিত্র আগেরগুলোর চেয়ে ভিন্ন হবে। আগামী ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আরো কিছু লংমার্চ শেষে ঢাকামুখী কর্মসূচি হতে পারে বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, আজকের লংমার্চ বাস্তবায়নে ঢাকা ও খুলনা মহানগর, যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ আশপাশের ১৯ জেলার নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ, মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল বিকালে উদ্বোধনী সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেন জামায়াত নেতারা।
আরও পড়ুন: সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে বাধ্য হবো: জামায়াত আমির
লংমার্চের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "সরকার গণভোটকে অস্বীকার করে জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। আমরা এই গণভোটের রায়সহ সাত দফা দাবি নিয়ে লংমার্চের মাধ্যমে জনগণের কাছে যাচ্ছি। এতে জনমত গঠন হবে। আর জনগণ যত রাস্তায় নামবে ততই দাবি আদায়ে সরকারের ওপর নিশ্চয়ই চাপ সৃষ্টি হবে।"
তিনি আরো বলেন, "সরকার জনগণের সঙ্গে কথা দিয়ে যে কথা রাখেনি, তারা যে দ্বিচারিতা করবে—সে বিষয়গুলো লংমার্চের জনসভায় জনগণকে অবহিত করব। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ব্যর্থতার বিষয়ে জনমত তৈরি হবে, একসময় জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে—এটাই লংমার্চের মূল উদ্দেশ্য।" তিনি বলেন, "আমরা তো কালকেই সরকারকে উৎখাত করতে চাচ্ছি না। আমাদের এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং একপর্যায়ে তারা দাবি পূরণের বিষয়ে আলোচনা করতে বাধ্য হবে।"
এর আগে গত মঙ্গলবার লংমার্চ বাস্তবায়ন নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, "দেশের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ১১ দলীয় ঐক্য আপাতত সহনশীল কর্মসূচি পালন করে আসছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়েই আমরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছি। কিন্তু সরকারের আচরণে বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। সরকারকে বলব, জনগণের মনোভাব অনুধাবন করুন; অন্যথায় পরিণতি ভালো হবে না।"
লংমার্চ বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রস্তুতি
আরও পড়ুন: বর্তমান সরকার জাতির ১২টা বাজিয়ে দিয়েছে: জামায়াত আমির
জামায়াত ছাড়াও ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকরা ঢাকা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফলে স্ব স্ব প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। সর্বশেষ প্রস্তুতি সম্পর্কে গতকাল মগবাজার দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "জনগণের সাত দফা দাবি আদায় এবং সরকারের ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদে তৃতীয় দফা লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লংমার্চ আগের দুটি লংমার্চের তুলনায় সবচেয়ে দীর্ঘ কর্মসূচি।"
সাত দফা দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "প্রথম দাবি হলো—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। সরকার জনগণের গণরায় অস্বীকার করে রাজনৈতিক সংকটকে আরো গভীর করছে। জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যার বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সার ও জ্বালানি সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং নতুন করে গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে।"
"নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক দলীয়করণ চলছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, চাঁদাবাজির ধরন পরিবর্তন হয়নি শুধু চাঁদাবাজদের পরিচয় ও দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে।"
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ঢাকা ও আশপাশের ১৯টি জেলার নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা এই লংমার্চে অংশ নেবেন। প্রায় ছয় শতাধিক গাড়ি নিয়ে লংমার্চ শুরু হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বহরে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে একদফা দাবিতে রূপান্তর হবে: জামায়াত আমির
তিনি বলেন, "লংমার্চ সফল করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে নিয়ম অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয়েছে। ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।"
লংমার্চের কারণে মহাসড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক কিছু অসুবিধা হতে পারে। এজন্য সাধারণ মানুষ, পথচারী, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, "আমরা মহাসড়কের এক পাশ ব্যবহার করে কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করব, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কম হয়।"
এছাড়া লংমার্চে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "সবাইকে সর্বোচ্চ ধৈর্য, সংযম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে—এমন আচরণ করা যাবে না। পথে কোনো নতুন গাড়ি বহরে যুক্ত হলে শেষ প্রান্তে যুক্ত হবে। নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত টিমগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি প্রত্যেক গাড়ির টোলের টাকা নিজ দায়িত্বে প্রস্তুত রাখতে হবে। তিনি লংমার্চ সফল করতে দেশবাসী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
ছয় পথসভা যেখানে
আরও পড়ুন: লংমার্চ থেকে ফিরে আমিরে জামায়াত সংসদে সরকারের পক্ষে সাফাই গাইবেন
ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ হবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আজ শনিবার সকাল ৭টায়। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখবেন। পথে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় প্রথম সভা হবে সকাল ৯টায়। এরপর বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়ে সকাল ১১টা; খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে বেলা সাড়ে ১২টা ও ফুলতলার বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বরে দুপুর ২টা; যশোরের মুড়লীর মোড়ে বিকাল সাড়ে তিনটা এবং ঝিনাইদহের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড মোড়ে বিকাল ৫টায় পথসভা হবে। সবশেষে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় রাত সাড়ে ৮টায় যোগ দেবে লংমার্চের বহর।
বিভিন্ন মহলের প্রতি সফলের আহ্বান
লংমার্চ সফল করতে যুব ও ছাত্রসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। গতকাল শুক্রবার বিকালে বাংলাদেশ যুবমিশন ও বাংলাদেশ ছাত্রমিশনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।
লংমার্চে দেশবাসীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াত। গতকাল বিকেলে এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান দলের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি।
আরও পড়ুন: পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত মেজর খন্দকার আব্দুল হাফিজ গ্রেপ্তার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন