০৩:৪৩ এম
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অন্তত ২৫টি ফ্লাইটে বোমা হামলার ভুয়া হুমকির কারণে বিমান চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এসব হুমকির জন্য কয়েকটি উড়োজাহাজ জরুরি অবতরণ ও গন্তব্য পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে একই ধরনের ঘটনায় বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের নিরাপত্তা তল্লাশি ও গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে সপ্তাহজুড়ে অন্তত ৩৩টি ফ্লাইট এই আতঙ্কের কবলে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিস, সার্বিয়া ও চেকিয়ায় এসব হুমকির ঘটনা ঘটে। রায়ানএয়ার, অ্যার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, ইজিজেট, এজিয়ান এয়ারলাইনস, আইবেরিয়া, স্কাই এক্সপ্রেস, এয়ার সার্বিয়া ও এলওটি পোলিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এতে প্রভাবিত হয়। তবে সব উড়োজাহাজ নিরাপদে অবতরণ করেছে। তল্লাশিতে কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যে লন্ডনের হিথ্রো ও বার্মিংহাম বিমানবন্দরেও রাতের মধ্যে বোমা হামলার হুমকি আসে। পরে মেট্রোপলিটন পুলিশের বিমানবন্দর নিরাপত্তা বিভাগের বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করে সেগুলোকে ভুয়া বলে শনাক্ত করেন।
আরও পড়ুন: ভারত ফিলিপাইনে ৬০টি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা করছে
এর আগে মঙ্গলবার ইউরোপের সাতটি উড়োজাহাজে একই ধরনের হুমকির পর তল্লাশি চালানো হয় বা সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি ফ্লাইটও বোমা হামলার হুমকির কারণে গন্তব্য পরিবর্তন করে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এসব ঘটনার পেছনে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা রাশিয়া বা ইরানের মতো কোনো রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ইউরোপজুড়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
রোম ও সোফিয়ার বিমানবন্দরে পাঠানো হুমকিমূলক ই-মেইলে ‘মেল স্টেট’ নামের একটি গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রুশ উগ্র ডানপন্থী, জাতীয়তাবাদী ও নারীবিদ্বেষী এই আন্দোলনটি ২০১৬ সালে ভ্লাদিস্লাভ পোজনিয়াকভ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তিনি এসব হুমকির দায় স্বীকার করেননি।
ই-মেইলে হুমকিদাতারা নিজেদের ওই গোষ্ঠীর সদস্য পরিচয় দিয়ে বিস্ফোরণের হুমকি দেয়। তাদের বার্তায় বলা হয়, এক ঘণ্টার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটবে। তবে এসব বার্তার সত্যতা বা গোষ্ঠীটির প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আয়ারল্যান্ডের কর্ক বিমানবন্দরেও বৃহস্পতিবার সকালে ফোনে একটি বেনামি হুমকি আসে। এতে লন্ডনের স্ট্যানস্টেড থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। অন্যদিকে ইতালির পেসকারা থেকে বেলজিয়ামের চারলেরোয়া বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে রায়ানএয়ারের আরেকটি উড়োজাহাজের টয়লেটের দেয়ালে ‘বোমা’ শব্দটি লেখা দেখতে পান সংশ্লিষ্টরা। পরে উড়োজাহাজটিতে তল্লাশি চালানো হয়।
আরও পড়ুন: যুক্তরাজ্যে ভারতীয় নাবিকের কারাদণ্ড নিয়ে বিতর্ক তীব্র
ইউরোপীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ইউরোপে মোট ২৭ হাজার ৪০০টি ফ্লাইট পরিচালনার কথা ছিল। সেই তুলনায় আক্রান্ত ফ্লাইটের সংখ্যা কম হলেও এর প্রভাব পড়েছে যাত্রীদের ভ্রমণসূচিতে।
ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে ইউরোপে সম্ভাব্য সমন্বিত তৎপরতা এবং ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি ‘আন্ডার-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার’—এমন এক ধরনের তৎপরতা, যার পেছনে কারা রয়েছে তা সরাসরি শনাক্ত করা কঠিন।
তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ নাকচ করেছে ক্রেমলিন। মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে রুশ প্রশাসনকে যুক্ত করার অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে ভুয়া বোমা হামলার হুমকি পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অল্প সময়ে এত বেশি ফ্লাইটকে লক্ষ্য করে হুমকি আসা সমন্বিত কোনো তৎপরতার ইঙ্গিত দিতে পারে। সাবেক বিমানচালক মার্টিন ড্রেক বলেন, উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ার পর হুমকি এলে তাৎক্ষণিকভাবে যাত্রাপথ পরিবর্তন বা জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ, সামান্য সন্দেহজনক হুমকিও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: এক ঘোষণায় মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পেলেন ৫৪৮ বন্দী
বিমান চলাচলবিষয়ক বিশ্লেষক রাইস জোনসের ধারণা, ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে এসব হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এমন স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে নিরাপত্তা সতর্কতা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে প্রকৃত হুমকি মোকাবিলাকে জটিল করে তুলতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন