০১:৪৫ এম
বিদেশে যে পরীক্ষার খরচ দেড় লাখ টাকা বা তার বেশি, সেই জিন বিশ্লেষণ পরীক্ষা এখন রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে মাত্র ১২ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকায় করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে স্বল্প খরচে ও দেশের ভেতরেই ক্যানসারের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার ধরন জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বারডেমের অণু-পরীক্ষা গবেষণাগারে যুক্তরাষ্ট্রের ইলুমিনা প্রতিষ্ঠানের আধুনিক মাইসিক ও নেক্সটসিক ৫৫০ যন্ত্র ব্যবহার করে ক্যানসারসংশ্লিষ্ট জিনের পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একসঙ্গে বহু জিন বিশ্লেষণ করে ক্যানসারের জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে, নির্দিষ্ট ওষুধে সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা কতটা কিংবা বংশগতভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা নির্ধারণেও সহায়তা করে এ প্রযুক্তি। বারডেমের এই গবেষণাগার আমার দেশ-এর প্রতিবেদককে ঘুরে দেখান হাসপাতালটির প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহরাব আলম।
বারডেমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে ১৪০টি জিনের পরিবর্তন পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে ১১১টি জিনের ডিএনএ এবং ২৯টি জিনের আরএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। ডিএনএ হলো জীবদেহের বংশগত বৈশিষ্ট্য বহনকারী উপাদান। আরএনএ জিনের নির্দেশনা অনুযায়ী কোষের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে ভূমিকা রাখে। এ দুটি উপাদান বিশ্লেষণ করে ক্যানসার কোষে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব। স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে বিআরসিএ-১, বিআরসিএ-২, পিআইকেথ্রিআইসিএ, টিপি৫৩ ও এটিএমসহ বিভিন্ন জিন পরীক্ষা করা হয়। ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে বিআরসিএ-১, বিআরসিএ-২, আরডি৫১সি ও বিআরআইপি-১ এবং ফুসফুসের ক্যানসারে ইজিএফআর, বিআরএএফ, কেআরএএস, এমইটি, এএলকে, আরওএস-১ ও আরইটি জিন বিশ্লেষণ করা হয়। এ ছাড়া পাকস্থলী, খাদ্যনালি, বৃহদান্ত্র, মলাশয়, যকৃৎ, পিত্তনালি, অগ্ন্যাশয়, ত্বক ও মস্তিষ্কের ক্যানসারসংশ্লিষ্ট জিনও পরীক্ষার আওতায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: বোয়িং ও এয়ারবাস কেনার সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন সংসদীয় কমিটিতে
অধ্যাপক সোহরাব আলম বলেন, মানুষের শরীর অসংখ্য কোষ দিয়ে গঠিত। প্রতিটি কোষের কেন্দ্রের মধ্যে থাকে ক্রোমোজোম, আর ক্রোমোজোমের মধ্যে রয়েছে জিন। জিন তৈরি হয় ডিএনএ দিয়ে। ডিএনএর গঠনে পরিবর্তন বা মিউটেশন হলে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হতে পারে। ধূমপান, ক্ষতিকর বিকিরণ ও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে জিনের এ পরিবর্তন ঘটতে পারে। কোন জিনে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, তা শনাক্ত করতে আধুনিক জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট একটি জিন বা তার বিশেষ পরিবর্তন পরীক্ষা করা হলেও নতুন প্রযুক্তিতে একসঙ্গে অনেক জিন বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এতে ক্যানসারের ধরন ও বৈশিষ্ট্য বুঝে রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা পাওয়া যায়।
ক্যানসারের চিকিৎসায় সব রোগীর জন্য একই ওষুধ বা পদ্ধতি কার্যকর হয় না। একই অঙ্গের ক্যানসার হলেও রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে। পরীক্ষায় এসব পার্থক্য শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট জিনের পরিবর্তনকে লক্ষ্য করে ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি নির্বাচন করতে পারেন। একে লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা বলা হয়। এটি রোগীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার একটি পদ্ধতি। এ ছাড়া চিকিৎসায় রোগীর সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা, ওষুধের বিরুদ্ধে ক্যানসার কোষের প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়া এবং রোগের ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে বংশগত ক্যানসারের ঝুঁকি শনাক্ত এবং চিকিৎসার পর শরীরে ক্যানসার কোষের সামান্য অংশ অবশিষ্ট রয়েছে কি না, তা মূল্যায়নেও জিন বিশ্লেষণ ভূমিকা রাখে।
বারডেমে স্তন ও ডিম্বাশয়ের বংশগত ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ণয়ে বিআরসিএ-১ ও বিআরসিএ-২ জিন পরীক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি এইচআরআর বা কোষের ডিএনএ মেরামতকারী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ২৭টি জিনের পরীক্ষা করা হয়। এসব জিনে পরিবর্তন থাকলে কোষের ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে এ তথ্য চিকিৎসার ধরন নির্ধারণে সহায়ক হয়।
অধ্যাপক সোহরাব আলম জানান, বাংলাদেশে এসব পরীক্ষার খরচ ১২ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা। অথচ বিদেশে একই ধরনের পরীক্ষা করাতে প্রায় দেড় লাখ টাকা বা তার বেশি ব্যয় হতে পারে। বিদেশে নমুনা পাঠানো এবং পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। দেশে পরীক্ষার সুযোগ থাকায় রোগীদের অর্থ ও সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিদেশে যাতায়াতের ভোগান্তিও কমবে। পরীক্ষার জন্য রোগীর টিস্যুর নমুনা অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত সংগ্রহ করা হয়। টিস্যুভিত্তিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে রোগীর টিস্যু পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ পর্যাপ্ত ক্যানসার আক্রান্ত টিস্যুর নমুনা প্রয়োজন। হাসপাতালের রোগতত্ত্ব বিভাগ থেকে নমুনার ক্যানসার আক্রান্ত অংশ নির্বাচন ও প্রস্তুত করা হয়। হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ার জন্য অতিরিক্ত কোনো খরচ নেওয়া হয় না। তবে পরীক্ষার আন্তর্জাতিক মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে গবেষণাগারটির আন্তর্জাতিক মান সনদ অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য আইএসও ১৫১৮৯:২০২২ স্বীকৃতি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে সমস্যা সমাধান সম্ভব: জামায়াত আমির
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন বলেন, ক্যানসার রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বারডেমে আধুনিক জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যানসারের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও রোগীর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, দেশে উন্নত ক্যানসার পরীক্ষা ও চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে হয়। দেশে আধুনিক পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। গবেষণাগারের আন্তর্জাতিক মান সনদ অর্জনের জন্য চেষ্টা রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে।
এদিকে বারডেমের নিজস্ব ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন। এ জন্য মূল হাসপাতালের আশপাশে অন্তত দুই একর জমি খুঁজছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল নির্মাণে আগে সরকারের কাছে প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হলেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা অনুমোদন পায়নি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন