০৯:১৯ এম
সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অস্থিরতার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে, যা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাকশিল্প অধ্যুষিত এই অঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের পাশাপাশি হামলার ঘটনাগুলোর পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৃত শ্রমিকদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি এবং পরিকল্পিত নাশকতার অভিযোগকে আলাদা করে দেখাও অত্যন্ত জরুরি।
সোমবার (২ নভেম্বর) শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এদিন সাভার-আশুলিয়ার ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। অন্তত আটটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হামলার ঘটনা ঘটে। নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
আরও পড়ুন: মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে বরিশাল নগরীতে ডিবি পুলিশের আকস্মিক চেকপোস্ট ও সাঁড়াশি অভিযান
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন সাংবাদিকদের জানান, শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন।
পুলিশ সুপার জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলা ও ভাঙচুরে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকজনকে আটক করার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তবে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে রোববার (১ নভেম্বর) সাভারের হেমায়েতপুরে একেএইচ গ্রুপের একটি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণার পর একদল বিক্ষোভকারী ওই কারখানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি সব কিছু ভাঙচুর শুরু করে এবং কারখানার ভিতরে থাকা প্রায় অর দশ শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে। পরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
শিল্পাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব ঘটনার কারণে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী এবং ব্যবসায়ীদের সাধারণ অভিযোগ হলো, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন থাকতেই পারে, কিন্তু সেই আন্দোলনের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ, যানবাহনে হামলা কিংবা কারখানায় ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আরও পড়ুন: রংপুরে ৩৩ ওয়ার্ডে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রোগ্রামের উদ্বোধন
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে হাজার হাজার মানুষ সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু আন্দোলন ও সহিংসতার কারণে কর্মস্থলে পৌঁছানো, জরুরি কাজে যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী এবং কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
একাধিক সাধারণ নাগরিকের উদ্বেগের বিষয় হলো, শ্রমিকদের দাবি আর কারখানায় হামলা চালানো ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য এক কি না, সেটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। নিরপরাধ শ্রমিকদের যেন হয়রানি করা না হয়, আবার হামলাকারীরাও যেন কোনো পরিচয়ের আড়ালে পার পেয়ে না যায়।
চলমান আন্দোলনে পোশাকশ্রমিকদের অন্যতম দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বাস্তবায়ন এবং বিনা কারণে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা। এসব দাবিকে কেন্দ্র করেই শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সরকার শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবি পর্যালোচনার জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও আন্দোলন শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের সঙ্গে কারখানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে এক করে দেখা উচিত নয়। আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগও তাঁরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: বাবুগঞ্জ কৃষি অফিসে ১০-১১ বছর ধরে দুর্নীতি ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকের তদন্ত দাবি কৃষকদের
এখন সাধারণ মানুষের কাছে একটাই প্রশ্ন, এইসব হামলা ও ভাঙচুরের পিছনে ইন্ধনদাতা কারা? সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কারা শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে? এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র, রাজনীতিক ফায়দা হাসিল, বহিরাগত গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল কাজ করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, প্রকৃত শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো নিরপরাধ শ্রমিক যেন অপরাধীর পরিচয় না পায় এবং কোনো অপরাধী যেন শ্রমিক পরিচয়ের আড়ালে আত্মগোপন করতে না পারে।
কারণ পোশাকশিল্প শুধু মালিক বা শ্রমিকের সম্পদ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের অর্থনীতি, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবিকা।
আরও পড়ুন: দিরাইয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২ পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই, দুশ্চিন্তায় ক্ষতিগ্রস্তরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন