০৮:২১ পি.এম
আফগানিস্তানে খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে তালেবান সরকার অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। তবে, এসব প্রকল্পের ফলে স্থানীয় জনগণের জমি, পানির অধিকার এবং জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের আয় থেকে তারা যথাযথ সুবিধা পাচ্ছেন না।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পশ্চিমা দেশগুলো দেশটিতে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। তবে চীন কাবুলে দূতাবাস খোলা রেখেছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়ার পর আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগও চীন দেখছে।
চীনের সঙ্গে তালেবান সরকারের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর শর্তের মুখে পড়লেও চীন তুলনামূলকভাবে কম শর্তে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। বর্তমানে চীন আফগানিস্তানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে চলতি বছরে অষ্টম পোলিও রোগী শনাক্ত, আক্রান্ত ১৩ মাসের শিশু
খনিজ সম্পদে চীনের আগ্রহ
আফগানিস্তানের তেল এবং তামার খনিতে চীনা কোম্পানিগুলোর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তালেবান সরকার চীনের জিনজিয়াং সেন্ট্রাল এশিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড গ্যাস কম্পানির সঙ্গে আমু দরিয়া অববাহিকায় তেল উত্তোলনের জন্য ২৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করে। কোম্পানিটি সেখানে ৫৪ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এছাড়া, লোগার প্রদেশের মেস আয়নাক তামার খনিতেও চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৮ সালে আগের আফগান সরকারের কাছ থেকে ৩০ বছরের জন্য খনিটির ইজারা পেয়েছিল একটি চীনা কনসোর্টিয়াম। নিরাপত্তা, শ্রম এবং পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটির কাজ আটকে ছিল। ২০২৪ সালে তালেবান সরকার প্রকল্পটি আবার চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে।
তবে, খনিজ সম্পদ উত্তোলন নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর বিরোধ বাড়ছে। ২০২৩ সালের আগস্টে উত্তর আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশের চাহ আব জেলায় সামতি সোনার খনির ইজারা দেওয়া হয় একটি চীন-আফগানিস্তান কোম্পানিকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখানে খনন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলবে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: জার্মানি সফরে আজ যাচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খনির কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পানির উৎসে প্রবেশাধিকার কমছে এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। বদাখশান প্রদেশেও চীনা অংশীদারিতে সোনা উত্তোলন নিয়ে জমি এবং পানির অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবাদ দমনের অভিযোগ
খনি প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ একপর্যায়ে সংঘর্ষেও গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তালেবান কর্তৃপক্ষ জানায়, চাহ আব জেলায় সংঘর্ষে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা এবং একটি খনি কোম্পানির এক কর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো পাঁচজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, খনির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কোম্পানিটির নাম বা মালিকদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও চীনা কোম্পানির সঙ্গে খনি চুক্তির কারণে সম্পত্তির ক্ষতি এবং প্রকল্পের আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেছিলেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও তারা প্রতিকার পাননি।
আরও পড়ুন: কাতারের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে মার্কিন এলএনজি নিয়ে ভারতের নজর
খনি এলাকার বাসিন্দারা রাস্তা, পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও দাবি করেছেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের প্রতিবাদ তালেবান কর্তৃপক্ষ দমন করেছে।
তালেবানের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক
চীন এখনও তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। ২০২৩ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর চীন প্রথম নতুন রাষ্ট্রদূত পাঠায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তালেবান সরকারের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে চীনের উরুমকিতে তালেবান এবং পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজন করে বেইজিং। এতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে চীনের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়।
আরও পড়ুন: বাইন্যান্স হ্যাকের এফবিআই অভিযোগকে ‘উসকানি’ বললেন কিমের বোন
তবে, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তালেবানের ওপর চাপ তৈরির ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা সীমিত। নারী অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তালেবান ব্যর্থ হলেও বেইজিং সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এতে আফগানিস্তানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ দুর্বল হতে পারে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
চীনের কৌশলগত স্বার্থ
আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পেছনে চীনের নিরাপত্তাগত স্বার্থও রয়েছে। বিশেষ করে জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ঠেকাতে তালেবানের সহযোগিতা চায় বেইজিং। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টের (ইটিআইএম) সদস্যরা আফগানিস্তানে চলাচল করছেন এবং তাদের একটি অংশ বদাখশান প্রদেশে অবস্থান করছেন।
এছাড়া, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ফিরে আসার সম্ভাবনাও চীনের উদ্বেগের কারণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চীন, রাশিয়া, ইরান এবং পাকিস্তান আফগানিস্তান এবং এর আশপাশে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে।
আরও পড়ুন: বাইন্যান্সে ৬০০ কোটি ডলারের অর্থ চুরির অভিযোগে মুখ খুলল উত্তর কোরিয়া
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর আফগানিস্তান পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়েও ২০২৫ সালের মে মাসে তিন দেশ সম্মত হয়। তবে সম্প্রসারণের কাজ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৬ সালের অক্টোবরে তালেবান সরকার চীনের সীমান্তের দিকে ওয়াখান করিডরে ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নুড়িপাথরের সড়ক উদ্বোধন করে। সেখানে এখনও বাণিজ্যিকভাবে সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা চালু হয়নি।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ চীনে নেওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ এবং বাজারের জন্য চীনের ওপর আফগানিস্তানের নির্ভরতাও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনের লেখক নাতিক মালিকজাদার মতে, চীনের বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সহায়তা তালেবান সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। অথচ যেসব এলাকার সম্পদ উত্তোলন করা হচ্ছে, সেখানকার মানুষের প্রকল্পের শর্ত নির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে আফগানিস্তানের সম্পদ থেকে আয় বাড়লেও স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রায় তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না।
ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট অবলম্বনে লিখেছেন সাংবাদিক নাতিক মালিকজাদা
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ, উপদেষ্টাদের মতভেদ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন