০৪:০০ পি.এম
ইসরায়েলের আগামী অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন একটি হিসাব-নিকাশের উন্মোচন ঘটেছে। তেল আবিবের প্রধান হাইওয়েতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টি যে বিশাল নির্বাচনী বিলবোর্ড স্থাপন করেছে, তাতে স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের শত্রু হিসেবে তুরস্ককে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ১৭ আগস্ট রাতে ড্রোনের মাধ্যমে দৃশ্যমান হওয়া ওই বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছবি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির পাশে স্থাপন করা হয়েছে। হিব্রু ভাষায় লেখা নির্বাচনী স্লোগানটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, "তারা চায় নেতানিয়াহু হেরে যাক। তাদের জিততে দেবেন না।"
বিলবোর্ডের এই বার্তা প্রকাশের পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বিষয়টিকে রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে সামরিক সংঘাতে রূপান্তর করা হয়। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দাহুর বিমানঘাঁটিতে আকস্মিক বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, ওই ঘাঁটিতে তুরস্কের একটি উদীয়মান সামরিক উপস্থিতি গড়ে উঠছিল, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। তবে নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময় বাকি থাকায়, প্রচারণামূলক বার্তার পরপরই এই সামরিক অভিযান একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নেতানিয়াহু কি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বাস্তব কোনো নিরাপত্তা হুমকি নস্যাৎ করেছেন, নাকি ব্যালট বাক্সে নিজের অবস্থান শক্ত করতে একটি সংকটকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তুলছেন?
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু সব সময় ইসরায়েলের মিস্টার সিকিউরিটি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন, যিনি দেশের যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। তবে সংকটকে রাজনৈতিক সুবিধায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার দীর্ঘ দুর্নাম রয়েছে।
আরও পড়ুন: এমপি আব্দুল আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল, ক্ষোভ বৃদ্ধি
এই হামলার বিরুদ্ধে বিরল ও প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত ও তুরস্কে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত টম বারাক। তিনি এই হামলাকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি হিসেবে অভিহিত করে পডকাস্টার মারিও নাউফালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের দিকে ইঙ্গিত করেন। বারাক বলেন, "এটি কেবল তুরস্ককে প্ররোচিত করার একটি ইসরায়েলি চেষ্টা হতে পারে।" তার ভাষায়, "এটি অত্যন্ত আগ্রাসী একটি পদক্ষেপ, তবে নির্বাচনের মুখে জনগণের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি চমৎকারভাবে কাজ করতে পারে।"
সরকারিভাবে ইসরায়েল এই হামলাকে নিছক সামরিক ও অভিযানের বাধ্যবাধকতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দুজনেই জানিয়েছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা জানতে পেরেছিল যে তুরস্ক ওই বিমানঘাঁটিতে তাদের সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সামরিক সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) খবর পেয়েছিল যে আঙ্কারা সেখানে কর্মী, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসাতে যাচ্ছে। এর ফলে সিরিয়ার আকাশে ইসরায়েলের স্বাধীন চলাচলের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ত এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য বদলে যেত। এই গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্প প্রশাসন এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে জানানো হয়েছিল বলেও নিশ্চিত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় উত্তেজনা প্রশমনে গত রবিবার জর্ডানে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যানের মধ্যে আবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
তবে এই সামরিক অভিযানের সময় নিয়ে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। ইসরায়েলি ব্যাখ্যাকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে তুরস্ক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অক্টোবর মাসের নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় বিস্তারবাদী ও অস্থিতিশীল নীতি অনুসরণের অভিযোগ তুলেছে। তুর্কি সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিরীয় সরকারের সঙ্গে আইনি কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢামেকে আনা হলো আনিসুল, পলক ও মামুন
এদিকে নেতানিয়াহু ও কাৎজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হামলার কথা অস্বীকার করে সিরিয়ায় তুর্কি সামরিক শক্তিকেন্দ্র গড়ে ওঠার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক বার্তা দিয়ে চলেছেন। নেতানিয়াহু পরিষ্কারভাবে বলেছেন, "আমরা কোনোভাবেই সিরিয়ায় তুর্কি সামরিক উপস্থিতি শিকড় গাড়তে দেব না, যা ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।"
একই সময়ে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে নিজের বাগাড়ম্বর ও ভাষা আরও কঠোর করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে সরাসরি এরদোয়ানকে "নিজের জনগণকে নিপীড়নকারী এক ইহুদি-বিরোধী স্বৈরাচারী" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দুই নেতার এই বৈরিতা অবশ্য নতুন নয়; গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধের পর থেকে তা আরও তীব্র রূপ নেয়। এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করে গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছেন, অন্যদিকে নেতানিয়াহু অভিযোগ করে আসছেন যে এরদোয়ান হামাসকে সমর্থন দিচ্ছেন। সম্প্রতি আঙ্কারার কাছে মার্কিন এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান বিক্রিরও তীব্র বিরোধিতা করে নেতানিয়াহু অঞ্চলের ওপর এরদোয়ানের আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
বামপন্থী সংবাদপত্র হারেৎজের প্রবীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হারেল মনে করেন, এই ঘটনায় নিরাপত্তা ও রাজনীতি; দুইটি দিকই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি নিশ্চিত করেন যে ইসরায়েলের প্রতি এরদোয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত শত্রুতাপূর্ণ এবং তুর্কিরা সিরিয়ায় এমন কিছু সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে যা আইডিএফকে উদ্বিগ্ন করেছে। তবে একই সঙ্গে হারেল এটিও উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক একটি কৌশল গ্রহণ করেছেন। এটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা থেকে শেখা এক শিক্ষা; সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা বাফার জোন গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিটি ফ্রন্টে আগেই আঘাত হানা। ২০২৪ সালে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার ভেতরে ইসরায়েল যে ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছিল, তা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে নির্বাচনের এমন মুহূর্তে বিরোধীদের মধ্যে সন্দেহ কেবল ঘনীভূতই হচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সামরিক অভিযানকে সঠিক বললেও এর পর ইসরায়েলের বিজয়ী প্রচারণাকে তিরস্কার করেছেন। তিনি বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োজন হলে আঘাত হানা জরুরি, তবে আঘাত হানার পর চুপ থাকাই শ্রেয়।"
আরও পড়ুন: বটিয়াঘাটায় তিন গুলির ঘটনায় গ্রেফতার নেই, ওসি প্রত্যাহার
অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান বিষয়টিকে প্ররোচনামূলক ও বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও এক ধাপ এগিয়ে লিখেছেন, "এই উত্তেজনার পেছনে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা জনগণকে আতঙ্কিত করে নির্বাচনের মাঠে সুবিধা পাওয়ার জন্য সাজানো হয়েছে।"
সব মিলিয়ে জনমত জরিপে নেতানিয়াহু এবং তার রাজনৈতিক জোট যখন পিছিয়ে রয়েছে, তখন সমালোচকরা ভয় পাচ্ছেন যে এই নতুন নিরাপত্তা সংকট রাজনৈতিক পটভূমিকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে এবং নেতানিয়াহুকে নির্বাচনী এজেন্ডা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন শেষ মুহূর্তে একটি নিরাপত্তা জরুরি অবস্থা তৈরি করাটাই রাজনীতিতে টিকে থাকার ও নির্বাচনে জেতার একমাত্র উপায়। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের অধীনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের বড় যুদ্ধের পরিধি সীমিত করে দিয়েছে এবং গাজা ও লেবাননে সেনা তৎপরতা সংকুচিত করেছে, তখন তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তই তার কাছে একমাত্র বিকল্প ফ্রন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে সামরিক নিরাপত্তার কথা বলা হলেও, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সন্দেহটাই এখন ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে সবচেয়ে বেশি জোর পাচ্ছে।
আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে দেশে আরও ২ জনের মৃত্যু
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন