০১:৩৮ পি.এম
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করেছেন যে, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে আয়নাঘরের দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল।
তিনি রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬। আজকের দিনটি আমাদেরকে বুকফাটা হাহাকার এবং তীব্র বেদনার অতল গহ্বরে নিয়ে যায়। বক্তব্যের শুরুতে তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জোরপূর্বক গুমের শিকার সকল মানুষকে।
আরও পড়ুন: কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থানের আহ্বান শামা ওবায়েদের
তিনি বলেন, স্মরণ করছি সেই সব মা-বাবা, ভাই-বোনদের, যারা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন- এই বুঝি তাদের সন্তান, স্বজন ফিরে এলো। স্মরণ করছি সেই স্ত্রীকে, যিনি প্রিয় স্বামীকে হারিয়ে একা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। স্মরণ করছি, সেই সন্তানকে, যার শৈশব পেরিয়ে গেছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু বাবা তাকে কোলে তুলে নিতে আর ফিরে আসেননি।
মির্জা ফখরুল বলেন, গুমের নির্মম শিকার সব ব্যক্তি, পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধার প্রতি তিনি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহমর্মিতা জানাচ্ছেন। গুম-নির্যাতনের শিকার সকল মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি তাদের আত্মার চিরশান্তি ও মাগফিরাত কামনা করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুম শুধু একটি মানুষকে কেড়ে নেয় না, এটি প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক অস্তিত্বকে কেড়ে নেয়। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-নির্যাতনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সবকটিকেই একসঙ্গে ভূলুণ্ঠিত করা হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই গুম, গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’ এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের বুকে চেপে বসেছিল। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছেন, তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে এবং গোপনে হত্যা করা হয়েছে। অথচ ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঘৃণ্য অপরাধকে সবসময় অস্বীকার করে এসেছে।
আরও পড়ুন: ধর্মমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে সাংবাদিকদের আহ্বান মন্ত্রণালয়ের
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা ভুলে যাইনি বিএনপির প্রথিতযশা নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, একটি ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষকে। যাদের পরিবারের প্রতিটি রাত কেটেছে বুকভরা বেদনা, অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষা নিয়ে। আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিককে বছরের পর বছর অন্ধকার, দুঃসহ পরিবেশে, আলো-বাতাসহীন আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, মঞ্চে উপবিষ্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সৌভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। কিন্তু এ দেশে আজও এমন বহু মানুষ আছেন, যারা আজ পর্যন্ত আর ফিরে আসেননি।
মির্জা ফখরুল বলেন, যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই স্বাধীন দেশে গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত অন্যায় আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে একটি ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এ এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অপমানজনক অধ্যায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই সময়ে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, যিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম, খুন, অত্যাচার, নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশেই হবে।
আরও পড়ুন: মায়ের মরদেহ রুমেই পড়েছিল, তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে উদ্ধার করে পুলিশ
মির্জা ফখরুল বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ বংশসহ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা শুধু বেদনাদায়কই নয়, অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। কমিশন ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত।
তিনি বলেন, এই প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া, বেছে বেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যা করার যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেই দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে এই বর্বর ও নৃশংস কাজগুলো বেশি করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে চলছে।
আরও পড়ুন: অবকাঠামো উন্নয়নে গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে : সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এরপর বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। যেসব পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা বহন করেছে, তাদের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে-কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের উন্নয়ন ও সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করে—সেটিই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। আর এমন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতেই আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সবশেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তিনি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চান, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।
আরও পড়ুন: হাইকোর্টে ৫৭ বেঞ্চ গঠন, রোববার থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু
তিনি বলেন, প্রতিটি গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের, তা সে যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাদের পেতেই হবে। এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। রাষ্ট্রের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব, গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো। তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন