০৯:৫৬ এম
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান চরম বিক্ষোভ ও নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় মোবাইল ফোন ও মানি ট্রান্সফারের অন্তত আটটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকানে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৭ লাখ ইউরোর বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংকটজনক পরিস্থিতিতে দোকান তালাবদ্ধ রেখে কিংবা ব্যক্তিগত পাহারা বসিয়েও প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এমনকি জরুরি প্রয়োজনে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও পুলিশের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সহায়তা পাননি বলে দাবি করেছেন তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে, জিএসআর ইনফোরমেটিক, থ্রি-জি ইনফরমেটিক, প্যারিস টেলিকম, আয়মান সার্ভিস, থ্রি-ডি ইনফোরমেটিক, ফোন স্টোর, বদি টেলিকম ও রাফিদ ইলেকট্রনিক। এসব প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন বিক্রির পাশাপাশি মানি ট্রান্সফারের সেবা দেওয়া হতো।
আরও পড়ুন: ‘ইরাকে আর কোনো মার্কিন সেনা নেই’ দাবি প্রধানমন্ত্রীর
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দোকানগুলোতে মজুত থাকা পণ্য ও নগদ অর্থ লুট করা হয়েছে। তবে আটটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
‘উঠে দাঁড়ানোর মতো আর কোনো সম্বল নেই’
ক্ষতিগ্রস্ত রাফিদ ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী রবিউল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইউরোর পণ্যসামগ্রী দোকানে ছিল। দোকান তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া সংঘবদ্ধ চক্র দোকানে লুটপাট চালায়। এখন আমার উঠে দাঁড়ানোর মতো আর কোনো সম্বল নেই।’
অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিনের দুটি প্রতিষ্ঠানে (ফোন স্টোর ও বদি টেলিকম) একযোগে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি জানান, মাত্র তিন মাস আগে চালু করা একটি শপসহ দুটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে তার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ইউরো।
আরও পড়ুন: ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান ফের শুরুর ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দুটি দোকান ছিল। দুটি দোকানেই পুরোপুরি লুটপাট হয়ে গেছে। পুলিশকে বারবার ফোন দিয়ে উদ্ধারের জন্য অনুরোধ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। দুটি দোকানের মধ্যে একটি মাত্র তিন মাস আগে শুরু করেছি। একটি দোকানে রিয়া মানি ট্রান্সফারের কাউন্টারে প্রায় ৩০ হাজার ইউরো নগদ ছিল। সব মিলিয়ে দুটি দোকানে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ইউরোর ক্ষতি হয়েছে।’
নতুন ব্যবসা শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই এমন ক্ষতির মুখে পড়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘বাংলাদেশি দোকানগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা’
প্যারিসের সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আইসার প্রেসিডেন্ট ওবায়দুল্লাহ কয়েছের অভিযোগ, বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বাংলাদেশি মালিকানাধীন মোবাইল ফোন ও মানি ট্রান্সফারের দোকানগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে।
আরও পড়ুন: ইরান হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের ৪ দূতাবাসে জনবল কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের নামে প্যারিসের বুকে এমন নৈরাজ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। নৈরাজ্যের সঙ্গে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের জড়িত থাকার অভিযোগ ফ্রান্সের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে। আমাদের আশঙ্কা, আজকের এই ভয়াবহ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আগামী দিনে ফ্রান্সের অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকে প্রবলভাবে শক্তিশালী করতে পারে।’
বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে একাধিক দোকানে লুটপাটের ঘটনায় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিজস্ব পাহারাতেও মিলছে না নিরাপত্তা
প্যারিসের মোবাইল ফোন ও মানি ট্রান্সফার ব্যবসায়ী মুহিবুর রহমান বলেন, ‘পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ী নিজেদের প্রতিষ্ঠান রক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। এরপরও বিভিন্ন স্থানে হামলা ঠেকানো যাচ্ছে না।’
আরও পড়ুন: উত্তাল প্রশান্ত মহাসাগরে ঝাঁপিয়ে ১৬ জনকে বাঁচালেন ২৪ বছর বয়সী উদ্ধারকর্মী
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ, দোকান বন্ধ রেখেও যদি প্রতিষ্ঠান নিরাপদ রাখা না যায়, তাহলে তাদের বিনিয়োগ ও জীবিকা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও মানি ট্রান্সফারের দোকানে মূল্যবান পণ্য ও নগদ অর্থ থাকায় লুটপাটের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণও বড় হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে মজুরি, পেনশন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। আয়োজক সংগঠনগুলোর হিসাবে এই সংখ্যা ছিল প্রায় আট লাখ। বিক্ষোভের বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, সরকারি ভবনে হামলা এবং দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা করল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন