০১:৩৩ এম
রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা লাগামহীনভাবে অপরাধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুলিশ কর্তৃক পরিচালিত নানা অভিযানে সেটা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বরং দিনের পর দিন ওই অপরাধীরা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। পুলিশ বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের মামলা নিতে অনীহা দেখানোর অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এমনই একটি পরিস্থিতিতে ছিনতাইয়ের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে রাজধানীবাসী। সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। আপনি যদি বাধা দেন, তবে অপরাধীরা গুলি করতেও দ্বিধা করছে না। বর্তমান সময়ে রাজধানীতে ৩ শতাধিক ছিনতাই স্পট রয়েছে। তবে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৫৫টি স্থানে। সেসব হটস্পটে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গত তিন মাসে রাজধানীতে ৮৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে মে মাসে মার্চ ও এপ্রিলের তুলনায় ছিনতাইয়ের সংখ্যা বেড়েছে। ভুক্তভোগী এবং পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের মাধ্যমে এসব তথ্য জানা যায়।
যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীতে পুলিশের কার্যক্রমের মধ্যেও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ছিনতাইকারী ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। পুলিশ গ্রেফতার করলেও অপরাধীরা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারো ছিনতাইয়ের কার্যক্রমে লিপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে ছিনতাইকারীরা আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে মানুষের সকল সম্পদ ডাকাতি করে চলেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মামলা ও জামিনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা দূর না করা যায়, তবে ছিনতাইকারীদের দমনে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। সম্প্রতি মতিঝিলের শাপলা চত্বরে প্রকাশ্যে দিনের বেলায় গুলি করে এক ব্যবসায়ীর টাকা ও ডলার ছিনিয়ে নেওয়া ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পুলিশ এখনও পর্যন্ত ওই ঘটনার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। তবে পুলিশের তরফ থেকে মতিঝিলের ঘটনার পর তারবার্তায় রাজধানীর প্রতিটি থানায় কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। উক্ত নির্দেশনায় গোয়েন্দা নজরদারি, টহল, চেকপোস্ট বৃদ্ধির পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। জামিনে থাকা দাগি আসামিদের তথ্য সংগ্রহ করেও, কেউ নতুন অপরাধে জড়ালে তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তারপরও সূত্র জানাচ্ছে, বর্তমানে রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২ জন, লালবাগে ১৫৯ জন, ওয়ারীতে ৩০৮ জন, মতিঝিলে ১৬৮ জন, তেজগাঁওয়ে ২৪০ জন, মিরপুরে ৫৩ জন, গুলশানে ৬৭ জন ও উত্তরায় ২৪০ জন দুর্দান্ত ছিনতাইকারী রয়েছে। তাদের ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে যায় এবং পুনরায় ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে। নতুন নতুন মুখ প্রতিদিন ছিনতাইয়ে যুক্ত হচ্ছে। তারা সুযোগ পেলেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বহুদিন আগে, রাজধানীতে ছিল ৯৮৯ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগরে ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও। গোয়েন্দা তথ্যানুসারে, রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের বাইরেও হাজারের বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। তারা সুযোগ পেলে ছুরি, চাপাতি অথবা সামুরাই নিয়ে ছিনতাই করছে।
আরও পড়ুন: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন সময়সীমা ১ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়াল ইসি
এছাড়া, সূত্র আরো জানাচ্ছে, রাজধানীতে অনেক ছিনতাই ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে না। কারণ অসংখ্য মানুষ মোবাইল ও মানিব্যাগ হারালে তারা সাধারণত হারানো জিডি দায়ের করে। যেকারণে ছিনতাইয়ের মামলা নিতে পুলিশও অনীহা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাজধানীতে ২৫টি ছিনতাই এবং এসব ঘটনার মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৯টি, মতিঝিল, গুলশান ও ওয়ারীতে ৪টি করে এবং রমনা ও লালবাগে ২টি করে ঘটনার কথা জানা যায়। ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে তেজগাঁওয়ে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে, পরের দিকে মতিঝিল ও ওয়ারী রয়েছে। রাজধানীতে ছিনতাইয়ের হটস্পট চিহ্নিত করে পুলিশ তিল তিল করে অভিযান চালানো সত্ত্বেও ছিনতাইয়ে রোধ করতে পারছে না। পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে বার বার সহজে মামলা নিতে বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।
এদিকে, রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের ব্যাপক তৎপরতা সম্পর্কে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম জানান, 'ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবসময় পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। অপরাধীদের নিয়মিতভাবে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু শতভাগ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সুতরাং গ্রেপ্তারের বাহিরে থাকা অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছে। আবার যারা গ্রেপ্তার হয়, তারাও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। তবে পুলিশ বাহিনী যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ডিএমপির সব থানায় কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সক্রিয় ছিনতাইকারীদের আইনশৃঙ্খলার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি জামিনে থাকা অপরাধীদের বর্তমান পরিস্থিতি জানতেও কাজ চলছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন