০৯:১১ এম
গাজীপুরের শিল্পনগরী কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কাঁচা বাজারে আগুন লেগেছে। অধিকাংশ সবজির দাম চড়া হওয়ায় ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি ফিরছে না। শীতের আগাম সবজির মৌসুম ঘনিয়ে এলেও কালিয়াকৈরের বাজারে এর কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ ক্রেতা, বিশেষ করে ৬ লক্ষ পোশাক শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়তি দামে সবজি কিনতে গিয়ে চরম চাপে পড়ছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি কালিয়াকৈরের বাজারে পড়েছে। তবে ক্রেতাদের মতে, এটি সিন্ডিকেটের কারসাজি।
শুক্রবার (০২ অক্টোবর) কালিয়াকৈর বাজার, চন্দ্রা ত্রিমোড় বাজার, পল্লী বিদ্যুৎ বাজার, মৌচাক বাজার, সফিপুর বাজার, কালামপুর ও ফুলবাড়িয়া বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব ধরনের সবজির দাম আকাশছোঁয়া। সব ধরনের সবজি কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। শিমের দাম সবচেয়ে বেশি, প্রতি কেজি ২০০ টাকা। বেগুন ৮০-১২০ টাকা কেজি, ফুলকপি ১৬০ টাকা পিস (ছোট সাইজ), গাজর ১২০ টাকা কেজি, টমেটো ১২০ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা কেজি, করলা ৮০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা, তরী (ঝিঙা) ৮০ টাকা, বাধাকপি ৮০ টাকা, বইকচু (মুখি) ৬০ টাকা, আলু প্রকারভেদে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৫০-৬০ টাকা কেজি, দেশি আদা ১৬০ টাকা, দেশি রসুন ১২০ টাকা, চায়না রসুন ১৮০ টাকা।
আরও পড়ুন: খাদ্যমন্ত্রী ৩১ শ্রমিককে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা উপহার দিলেন
মুরগির বাজারে দাম তেমন পরিবর্তন নেই, তবে তা-ও চড়া। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা কেজি, পাকিস্তানি (সোনালী) মুরগি ২৮০ টাকা, লেয়ার ৩৬০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৭৬০ টাকা এবং খাসির মাংস ১০০০ টাকা কেজি। ফার্মের মুরগির ডিমের দাম বেড়ে প্রতি হালি ৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ও হাঁসের ডিম ৭০ থেকে ৮০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া। অন্যান্য মাছের দামও চড়া। রুই মাছ আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বড় কাতল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ছোট দেশি মাছ - পুঁটি, টেংরা, মলা ৪৫০-৬০০ টাকা কেজি, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।
কালিয়াকৈর বাজারে বাজার করতে আসা পোশাক শ্রমিক আব্দুস সালাম (৩৫) ও মোকলেস বলেন, “প্রতিদিনই কোনও না কোনও পণ্যের দাম নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে। ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। ঘর ভাড়া ৪ হাজার। বাকি ৬ হাজার দিয়া সংসার চলে না। পরিবারের প্রয়োজনীয় সব পণ্য কিনতে গেলে বাজেটের চেয়ে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। ১ কেজি শিম ২০০ টাকা, এইটা কি মগের মুল্লুক? বাজারে গেলে কান্না আসে।”
মৌচাকের গৃহিণী রহিমাখাতুন (৪২) বলেন, “আগে ৫০০ টাকা নিয়া বাজারে গেলে ব্যাগ ভরে যাইতো। এখন ১০০০ টাকায় এক বেলার বাজারও হয় না। বাচ্চারে একটা ডিম দিতে গেলেও হিসাব করতে হয়। শীতের সবজি বাজারে এলে দাম কিছুটা কমবে এটাই আশা করছি, কিন্তু এখন কি খামু?”
আরও পড়ুন: দেশকে এগিয়ে নিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: আবু হানিফ
সফিপুরের অটো চালক সিয়াম হোসেন (২৮) বলেন, “সারাদিন অটো চালাইয়া ৬০০ টাকা পাই। চাল কিনমু, ডাল কিনমু, নাকি সবজি কিনমু? সবকিছুর দাম বাড়তি। সরকার কি এই বাজার দেখে না? মনিটরিং নাই, কোনো অভিযান নাই। ব্যবসায়ীরা যা খুশি তাই দাম নিতাছে।” কালিয়াকৈর বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মোঃ সহিদুল ইসলাম বলেন, “ভাই, আমরা বেশি দামে কিনি, বেশি দামে বেচি। শীতের সবজির সরবরাহ বাড়লে বাজারে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে বর্তমানে চাহিদা ও সরবরাহ, পরিবহন খরচ এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রতিদিনই কিছু পণ্যের দামে পরিবর্তন হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। বগুড়া, যশোর থেকে সবজি আনতে আগে ট্রাক ভাড়া লাগতো ৮ হাজার, এখন লাগে ১২ হাজার।” তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহন খরচের দোহাই দিয়ে ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। কালিয়াকৈর উপজেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং টিমের কোনো তৎপরতা নেই। ভোক্তা অধিকারের অভিযান না থাকায় ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া।
এই অস্থির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কালিয়াকৈর পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী, শিক্ষানুরাগী, বিশিষ্ট সমাজসেবক ও গণমানুষের নেতা দেওয়ান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, “কালিয়াকৈরের হাট-বাজারে যে আগুন লেগেছে, এটা কাঁচা বাজারের আগুন নয়, এটা গরীবের পেটে আগুন। আমাদের কালিয়াকৈর হলো ৬ লক্ষ পোশাক শ্রমিকের শহর। এই শ্রমিকরা রোদে পুড়ে, ঘাম ঝরিয়ে দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে। অথচ আজ তারা বাজারে গিয়ে ২০০ টাকা কেজি শিম, ৯০ টাকা কেজি বেগুন কিনতে পারছে না। ভাত জুটলেও তরকারি জুটছে না। এর চেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে? আমি আজ কালিয়াকৈর বাজার, মৌচাক, চন্দ্রা ঘুরে দেখেছি। ক্রেতারা কাঁদছে। কিন্তু প্রশাসনের কোনো মনিটরিং নেই, ভোক্তা অধিকারের কোনো অভিযান নেই। এই সুযোগে একটি অসাধু সিন্ডিকেট ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকা নিচ্ছে। আমি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছি - শ্রমিকের ঘামে গড়া এই শহরে লুটপাট চলতে দেব না। আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে কালিয়াকৈরের প্রতিটি বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করুন, প্রতিটি দোকানে মূল্য তালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করুন। পৌরসভার পক্ষ থেকে ন্যায্যমূল্যের অস্থায়ী কাঁচা বাজার চালু করতে হবে।
আল্লাহ যদি আমাকে পৌরসভার খেদমত করার সুযোগ দেন, তাহলে আমার প্রথম অঙ্গীকার হবে- কোনো বাজারে চাঁদাবাজি থাকবে না, প্রতিদিন সকালে পৌর ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে বাজার মনিটরিং হবে, কৃষক যাতে সরাসরি বাজারে সবজি বিক্রি করতে পারে সেই ব্যবস্থা করবো। মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ভেঙে দেব। জনগণের পাশে ছিলাম, জনগণের পাশে আছি। এলাকা বাসী তার এই মানবিক ও জোরালো বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, এমন জনবান্ধব নেতৃত্বই কালিয়াকৈরের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন। এলাকা বাসীর দাবি, দ্রুত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হোক। নইলে এই শিল্পনগরীর লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পরিবার না খেয়ে মরবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতায় সমঝোতা স্বাক্ষর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন