০৯:৩৩ পি.এম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ৬ হাজার ৮২৭ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ লাখ টাকা। এই বরাদ্দের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্যের স্বাস্থ্যসেবায় বছরে বরাদ্দ পড়ছে ১০২ টাকা ৫৪ পয়সা। মাসের হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ মাত্র ৮ টাকা ৫৫ পয়সা।
সীমিত এই বরাদ্দের পাশাপাশি ওষুধের সংকট, চিকিৎসক ও জনবল ঘাটতি এবং রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ও একাডেমিক শাখার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কুবির মোট বাজেট ৮৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ ৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের শূন্য দশমিক শূন্য ৮৪ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বুটেক্সের অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান খানের মৃত্যুতে উপাচার্যের শোক
একাডেমিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৬ হাজার ২১৩ জন শিক্ষার্থী, ২৮৬ জন শিক্ষক এবং ৩২৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ হাজার ৮২৭ জন।
মেডিকেল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ ছিল ৬ লাখ টাকা করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৭ লাখ টাকা করা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও একই পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এই ৭ লাখ টাকার প্রায় ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা ও মেরামতে ব্যয় হয়। বাকি ৮০ শতাংশ ওষুধ কেনায় ব্যয় করা হয়।
মেডিকেল সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে ওষুধ কেনার জন্য বরাদ্দ থাকে ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৯ হাজার টাকা ভ্যাট হিসেবে চলে যায়। ফলে ওষুধ কেনায় কার্যত ব্যয় করা যায় ৫১ হাজার টাকা। এই অর্থে মাসে ১২ ধরনের ওষুধসহ অন্যান্য ওষুধসামগ্রী কেনা হয়। তবে মেডিকেল সেন্টার থেকে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ করা হয় না।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত জবি শিক্ষার্থী নাবিলা
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধই মেডিকেল সেন্টারে পাওয়া যায় না। ফলে সামান্য অসুস্থতার চিকিৎসা নিতেও তাঁদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বায়েজিদ হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অবহেলিত সেক্টর হচ্ছে মেডিকেল সেক্টর। শিক্ষার্থীরা এখানে ন্যূনতম সেবা পায় না। ছয় হাজার শিক্ষার্থীর জন্য দুটি অ্যাম্বুল্যান্স যথেষ্ট নয়। আমি দাঁতের ব্যথার জন্য মেডিকেল সেন্টারে গিয়েছিলাম। আমাকে শুধু গ্যাসের ট্যাবলেট আর এইস দেওয়া হয়েছে।’
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে নাপা সেন্টার বলা হয়। বর্তমানে কিছু ওষুধ আসছে। কিন্তু এতে পরিপূর্ণ সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো শিক্ষার্থীর জ্বর হলে তাকে ব্লাড টেস্টের জন্য শহরে যেতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘ছোটখাটো সমস্যার জন্য যে সেবাটা প্রয়োজন, সেটাও যথেষ্ট পরিমাণে নেই। পরিপূর্ণ একটি সেবাদান কেন্দ্র করতে হলে একটি মিনি প্যাথলজি, একজন ফার্মাসিস্ট ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন: অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে : বাউবি ভিসি
অর্থ ও ওষুধের সংকটের পাশাপাশি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসকের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। সেখানে পাঁচজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও একজন শিক্ষাছুটিতে থাকায় বর্তমানে কর্মরত আছেন চারজন। এর বাইরে দুজন খণ্ডকালীন চিকিৎসক, একজন সহকারী রেজিস্ট্রার, একজন নার্স ও তিনজন সাপোর্টিভ স্টাফ রয়েছেন।
মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের স্টেকহোল্ডারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, ওষুধের চাহিদাও বাড়ছে। সে তুলনায় ওষুধের জোগান কম আছে। প্রতিবছর ইন্সট্রুমেন্ট কিনতে মোট বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ খরচ হয়। প্রতি মাসে যে পরিমাণ ওষুধ কেনা হয়, সেই টাকার ১৫ শতাংশ মেডিকেল ট্যাক্স দিতে হয়।’
জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিপরীতে আমাদের জনবলও কম আছে। উপাচার্য স্যারকে জানিয়েছি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের কিছু লোকবল দরকার।’
মেডিকেল সেন্টারে একজন আবাসিক চিকিৎসক, একজন ফার্মাসিস্ট ও একজন ক্লিনার প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে বন্ধের দিনগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আবাসিক চিকিৎসক এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনার জন্য ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ শুরু ১৬ নভেম্বর
মেডিকেল সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের ছোটখাটো রোগ শনাক্ত করতেও ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে একটি মিনি প্যাথলজি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের যদি মিনি প্যাথলজি থাকত, এখন যে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা যেত।’
তবে মিনি অপারেশন থিয়েটার চালুর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘আগামী কিছুদিনের মধ্যে আমাদের মিনি অপারেশন থিয়েটার চালু হবে। সেখানে আমরা প্রাথমিক ট্রিটমেন্টগুলো দিতে পারব। সবকিছু প্রস্তুত আছে, রুমটি বুঝে পেলেই আমরা কার্যক্রম শুরু করতে পারব।’
মেডিকেল সেন্টার সূত্র জানায়, বর্তমানে রাত ৮টা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা চালু থাকে। সম্প্রতি চিকিৎসক ও নার্সদের দায়িত্ব ভাগ করে রোস্টার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ছুটির দিনেও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সপ্তাহান্তে রোস্টার চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মেডিকেল সেন্টারের পাশাপাশি আবাসিক হলগুলোতেও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন, নতুন সূচি ২ ও ৩ নভেম্বর
সীমিত বরাদ্দে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে ওষুধ, জনবল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ, জনবল ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা নিশ্চিত করা হোক।
চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ কম থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে আমরা আরও বাজেট চাই। সেক্ষেত্রে বেশি বাজেট পেলে চিকিৎসা খাতেও বাজেট বাড়াতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ওষুধের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই পরিমাণ ওষুধ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে একটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে: ডিআইইউ উপাচার্য
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন