০৪:২৯ পি.এম
জাপানে বিদেশি বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং সামাজিক বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা এ তথ্য জানিয়েছেন। তাদের মতে, আগে কোরিয়ান ও কুর্দি বংশোদ্ভূত বাসিন্দারা বেশি বৈষম্যের শিকার হতেন, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়কেও একইভাবে হয়রানির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, গুজব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পরিবেশনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন মসজিদে নিয়মিতভাবে হুমকিমূলক ফোনকল ও ইমেইলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বহু মুসলিম পরিবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছাবে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার। বর্তমানে দেশজুড়ে ১৬০টিরও বেশি মসজিদ রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধিতে সীমিত পরিসরের বাজেটের পথে যুক্তরাজ্য
গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওসাকায় একটি মসজিদ থেকে উচ্চস্বরে আজান দেওয়ার মতো গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। পরে অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হোক্কাইডোর এবেতসু শহরে পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের পরিচালিত একটি মসজিদ এবং ব্যবহৃত গাড়ির শোরুমে একাধিক সন্দেহজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া টোকিওর কাছের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের ফুজিসাওয়ায় একটি নতুন মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
উত্তর কান্টো অঞ্চলের একটি মসজিদের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যিনি নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, জানাচ্ছেন যে গত এক বছর ধরে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, প্রতিদিন কয়েকটি ঘৃণামূলক ফোনকল এবং ইমেইল আসে, যেখানে মুসলিমদের জাপান ছাড়ার আহ্বান জানানো হয় এবং মসজিদ নির্মাণের বিরোধিতা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রায় তিন দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে। নতুন অভিবাসীদের সমাজের সামাজিক নিয়ম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে। কিন্তু নতুন সময়ে সেই ইতিবাচক পরিবেশে পরিবর্তন আসছে।
আরও পড়ুন: ঘোষণা দিয়েও নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে পারল না সৌদি এয়ারলাইন্স
নামাজ পড়তে আসা এক পাকিস্তানি শিক্ষার্থী জানাচ্ছেন, তার জাপানি বন্ধু ও সহপাঠীরা ধর্মীয় পরিচয়কে সম্মান করেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনাপূর্ণ প্রচারণা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। তার প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক যখন ইতিবাচক, তখন এই ঘৃণার উৎস কোথায়?
জাপানে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একজন তরুণ উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিদ্বেষ যদি নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তা বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
এদিকে, মুসলিম জনগণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামিক কবরস্থান, হালাল খাবার এবং ধর্মীয়ভাবেও উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে জাপানের প্রচলিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে এসব প্রয়োজনের সমন্বয় নিয়ে এখনো নানা আলোচনা চলছে।
আইচি প্রিফেকচারাল ইউনিভার্সিটির গবেষক মিচিতো ওহাশি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় ছোটখাটো ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করার ফলে অনেক সময় অযথা ভয় এবং ভুল ধারণা তৈরি হয়। তার মতে, বিদ্যমান বিদ্বেষবিরোধী আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: সরকারের সমালোচনা করলেই গ্রেপ্তার মানবাধিকারের লঙ্ঘন: আখতার হোসেন
ওহাশি বলেছেন, মুসলিমদের শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে না দেখে সমাজের সাধারণ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ। তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন