০৬:১৫ পি.এম
কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে অপহরণকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে র্যাব। সংস্থাটির দাবি, সাম্প্রতিক অধিকাংশ অপহরণের পেছনে রয়েছে মাদক-সংশ্লিষ্ট স্বার্থ ও অনলাইনে বিভিন্ন ফাঁদ।
এদিকে, ফেনী থেকে চাকরির প্রলোভনে চার যুবককে টেকনাফে এনে অপহরণের ঘটনায় জড়িত দুইজনকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছে র্যাব। অপহরণকারী চক্রের বিরুদ্ধে শিগগিরই বড় পরিসরের বিশেষ অভিযানেরও আভাস দিয়েছে বাহিনী।
রোববার দুপুরে র্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নটির উপ-অধিনায়ক মেজর এইচ এম মারুফ জানান, ফেনী থেকে চাকরির প্রলোভনে ৪ যুবককে কক্সবাজারের টেকনাফ এনে অপহরণ ঘটনায় জড়িত দুই দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘বসন্তের কোকিল’ হিসেবে পরিচিত কাজী জাহিদ অভি? পূজামণ্ডপে অনুদান, ক্যানসার আক্রান্ত হাফেজকে সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী জুম্মাপাড়া মৃত সুলতান আহমদের ছেলে মো. রাসেল (২৮) এবং একই এলাকার রশিদ আহমদের ছেলে মো. আরমান (২১)।
ভুক্তভোগীরা হলেন, ফেনী জেলার এমাম হোসেন (১৯), জিসান (২৩) ও তৌহিদুল ইসলাম (১৯) এবং হবিগঞ্জ জেলার সুমন মিয়া প্রকাশ হোসাইন (২২)।
সংবাদ সম্মেলনে মেজর এইচ এম মারুফ বলেন, ফেনীতে চাকরির সুবাদে ভুক্তভোগী ৪ যুবকের সঙ্গে মো. রাসেলের মধ্যে পরিচিতি ছিল। গত ২৬ জুন ওই যুবকদের চাকরির প্রলোভনে দেখিয়ে টেকনাফ নিয়ে আসে রাসেল। পরে তাদের অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে টেকনাফের গহিন পাহাড়ের আস্তানায় জিম্মি রেখে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে দুর্বৃত্তরা। মুক্তিপণ আদায় করায় জিন্মিদের উপর দুর্বৃত্তরা শারীরিক নির্যাতন চালায়। ঘটনাটি অবহিত হওয়ার পর অপহৃতদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে র্যাব ও পুলিশ।
এক পর্যায়ে গত ৩০ জুন র্যাব ও পুলিশের একটি বিশেষ দল টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী জুম্মাপাড়া সংলগ্ন গহিন পাহাড়ে অভিযান চালায়। এতে দুর্বৃত্তদের আস্তানাটি ঘিরে ফেললে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে জিম্মিদের ফেলে পালিয়ে যায়। পরে অপহৃত ৪ জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় উদ্ধার ভুক্তভোগী জিসান বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় সংশ্লিষ্ট আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
আরও পড়ুন: স্বাধীনতার পরও পাকা হয়নি সড়ক, দুর্ভোগে পাঁচ গ্রামের মানুষ
র্যাবের এই ব্যাটালিয়ন উপ-অধিনায়ক বলেন, মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর থেকে ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেফতারে র্যাব অভিযান শুরু করে। এক পর্যায়ে শনিবার রাতে টেকনাফের রঙ্গিখালী সংলগ্ন গহীন পাহাড়ি আস্তানাটিতে মামলার আসামিরা অবস্থানের খবর পায় র্যাব। পরে র্যাবের একটি বিশেষ দল সেখানে অভিযানে গেলে ৪/৫ জন সন্দেহজনক লোক দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা চালায়। এসময় ধাওয়া দিয়ে ২ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও অন্যরা পালিয়ে যায়।
গ্রেফতার আসামিদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান, মেজর এইচ এম মারুফ।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র্যাবের উপ-অধিনায়ক মেজর এইচ এম মারুফ বলেন, বর্তমানে সংঘটিত অধিকাংশ অপহরণের ঘটনা শুধু মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে হচ্ছে না। এসব ঘটনার সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া অনেকেই অনলাইনের বিভিন্ন ফাঁদে পড়ে অপহরণের শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘র্যাবের পক্ষ থেকে যে পরিসংখ্যান আপনাদের দেওয়া হয়েছে, সেটি খুবই স্বল্প সময়ের। সারা বছরজুড়েই প্রতি মাসে এ ধরনের অপহরণের ঘটনা ঘটে। আমরা সব সময় প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করি না। তবে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের সঙ্গে শেয়ার করা হয়। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’
আরও পড়ুন: কেরানীগঞ্জে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ২৪ ঘণ্টা পাহারায় বিএনপির নেতাকর্মীরা
মেজর মারুফ জানান, টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় অপহরণের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটছে। এসব এলাকার বিষয়ে যদি আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে র্যাব অপরাধী চক্রকে গ্রেপ্তারে আরও বড় পরিসরে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করবে।
তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের সঙ্গেও আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এত বড় একটি অপরাধ নির্মূলে শুধু একটি বাহিনীর পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করছে। এ অপরাধ সমূলে নির্মূল করতে হলে সব বাহিনীর চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি র্যাব এলিট ফোর্স হিসেবে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেসব টার্গেটেড অপারেশন পরিচালনা করে, ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে অপহরণ পুরোপুরি নির্মূল করতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেজর মারুফের ভাষ্য, যেসব এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে, সেখানকার মানুষের কাছ থেকে সময়মতো তথ্য পাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। আশা করি, জনগণের সহযোগিতা পেলে এ অপরাধ দমনে আরও সফল হওয়া সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: কেরানীগঞ্জে জমি বিরোধে বসতবাড়িতে হামলা, টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট
মেজর মারুফ আরও বলেন, টেকনাফের পাহাড়ি এলাকাগুলো দুর্গম হওয়ায় সেখানে চলাচল ও অভিযান পরিচালনা তুলনামূলকভাবে কঠিন। অনেক স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কম থাকায় অপরাধীরা এসব এলাকা ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তবে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে র্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, টেকনাফ উপজেলায় র্যাবের দুটি ক্যাম্প রয়েছে। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য স্থান থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে এসব এলাকায় অভিযান পরিচালনা আমাদের জন্য কঠিন হবে না।
মেজর মারুফ জানান, অপহরণের অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা পাহাড়ি এলাকাকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে র্যাবের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এ প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে বড় পরিসরের বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষা রোহিঙ্গারা তুলনামূলক দ্রুত রপ্ত করে ফেলতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে মিশে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করে। তবে সব অপহরণের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে-এমন ধারণা সঠিক নয়।
আরও পড়ুন: পিরোজপুরে ট্রলার ডুবিতে ৮ বছরের মেয়ের লাশ উদ্ধার, মা নিখোঁজ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন