০৪:০৫ এম
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কারাগারে বন্দির হার, ধারণক্ষমতার তুলনায়, সবচেয়ে বেশি। দেশের কারাগারগুলোতে প্রতি ১০০ বন্দির জন্য ২২৬ জন বন্দির জায়গা রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দির দিক দিয়ে, বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তবে ভারত ও পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ (ডব্লিউপিবি) নামক একটি অনলাইন তথ্যভাণ্ডারে বিভিন্ন দেশের কারাগারে বন্দী সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস পলিসি রিসার্চ এই তথ্যভাণ্ডারটি পরিচালনা করে। বাংলাদেশের তথ্য তারা জাতীয় কারা অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবহার করে সংগ্রহ করেছে। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের লড়াই বদলে দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট
ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে ৪৫ হাজার ১৮৬ জন বন্দী রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বন্দীর সংখ্যা ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। এই হিসাবে, মোট ধারণক্ষমতার ২২৬ দশমিক ১ শতাংশ বন্দি বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে রয়েছে। দেশের প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে কারাবন্দি রয়েছেন ৫৯ জন।
বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বন্দির সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজারে পৌঁছেছে। কারাগারের বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিচারাধীন বন্দির শতকরা হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে, ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ।
শ্রীলঙ্কায় কারাগারে ধারণক্ষমতার ২১৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৬৩ শতাংশ, নেপালে ১৪৪ শতাংশ, ভারতে ১১৩ শতাংশ এবং মিয়ানমারে ১১২ শতাংশ বন্দি রয়েছে।
আরও পড়ুন: নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের দাবি জানালো নিসচার
বিশ্বের হিসাবে, ধারণক্ষমতার সবচেয়ে বেশি বন্দি কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে, ৬১৭ শতাংশ। নাউরুতে, সবচেয়ে কম, মাত্র ১৪ শতাংশ বন্দী থাকে।
বাংলাদেশে কারাবন্দির সংখ্যা সময়ের সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডব্লিউপিবি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে। সে বছর বাংলাদেশে কারাবন্দি ছিলেন ৬২ হাজার ৬৬৯ জন। এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্দী ছিল ২০০৮ সালে, ৮৬ হাজার ৮৩৮ জন। ২০২০ সালে কারাগারে বন্দী ছিলেন ৮৮ হাজার ৮৪ জন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় বাংলাদেশে কত বন্দী ছিলেন, সে সম্পর্কে ডব্লিউপিবির ওয়েবসাইটে আলাদা তথ্য নেই। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘কারাগারগুলোতে এখন বন্দী ৭৭ হাজার, ধারণক্ষমতার দেড় গুণের বেশি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগের দিন দেশের কারাগারগুলোতে বন্দী ছিলেন ৮৮ হাজার। ১২ আগস্ট বন্দির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৯ হাজারে। এরপর থেকে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে জানান, সাধারণত দেশের কারাগারগুলোতে ৮০-৮২ হাজার বন্দী থাকে। বর্তমানে এক লাখের ওপর বন্দী রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার বেশি হচ্ছে। মাদক মামলা, সাইবার ক্রাইম ও কিশোর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আসছে। এতে কারাগারগুলোর ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: রামপালে ফয়লাহাট আছিয়া মাদ্রাসার সুবর্ণজয়ন্তী ও মিলনমেলা অনুষ্ঠিত
কারাগারে বিচারাধীন বন্দি বেশি
বাংলাদেশ কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৮ সালে ঢাকায় একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশে কারাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৩৬ সালে ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লায় কারাগার নির্মাণ করা হয়। ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারকে ১৯২৯ সালে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
দেশে ৭৫টি কারাগার রয়েছে, এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৬০টি জেলা কারাগার।
ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে মোট বন্দির ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিচারপূর্ব বন্দী হিসেবে রয়েছেন। অর্থাৎ কারাগারগুলোতে থাকা বন্দিদের দুই-তৃতীয়াংশের এখনো সাজা হয়নি।
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ বর্তমানে ভারত। এরপর চীন। দুই দেশের জনসংখ্যা ১৪০ কোটির ওপরে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩৫ কোটির কাছাকাছি। ডব্লিউপিবির হিসাবে, ভারত ও চীনকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি বন্দী যুক্তরাষ্ট্রে।
তবে বিচারপূর্ব বন্দির শতকরা হারে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কারাগারে বিচারপূর্ব বন্দির শতকরা হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে, ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ। শ্রীলঙ্কায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। নেপালে ৫৩ শতাংশ।
বিশ্বের হিসাবে বিচারাধীন বন্দি সবচেয়ে বেশি ইউরোপের দেশ সান মারিনোয়। দেশটিতে শতভাগ বন্দি বিচারাধীন বলে উল্লেখ করেছে ডব্লিউপিবি।
আরও পড়ুন: বিমানের দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত
কোন দেশে কত বন্দি
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ বর্তমানে ভারত। এরপর চীন। দুই দেশের জনসংখ্যা ১৪০ কোটির ওপরে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩৫ কোটির কাছাকাছি।
ডব্লিউপিবির তথ্যমতে, ভারত ও চীনকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি বন্দী যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা ১৮ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। দেশটিতে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে কারাবন্দি ৫৪২ জন।
যুক্তরাষ্ট্রের পর রয়েছে চীন। দেশটিতে মোট কারাবন্দির সর্বশেষ ২০১৮ সালের হিসাব প্রকাশ করেছে ডব্লিউপিবি। ওই বছর দেশটিতে বন্দী ছিলেন ১৬ লাখ ৯০ হাজার জন। সে হিসাবে প্রতি লাখ মানুষের বিপরীতে ১১৯ জন কারাগারে বন্দী ছিলেন। চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত। ২০২৪ সালে দেশটিতে বন্দী ছিলেন ৫ লাখ ১১ হাজারের বেশি, অর্থাৎ প্রতি লাখ মানুষে ৩৬ জন বন্দি ছিলেন।
আরও পড়ুন: দ্রুত সময়ে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক দৃশ্যমান হবে: প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব
ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮ হাজার। এ ছাড়া ২০২০ সালে মিয়ানমারে কারাবন্দি ছিলেন ১ লাখের কিছু বেশি মানুষ। চলতি মাস পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় বন্দী রয়েছেন প্রায় ৩৭ হাজার ৮০০ জন। গত আগস্ট পর্যন্ত নেপালের কারাগারে বন্দী ছিলেন ২৭ হাজার ৮০০ জন। আর ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভুটানে বন্দী ছিলেন মাত্র ১ হাজার ১১৯ জন।
বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশের মধ্যে ব্রাজিলে ৯ লাখ ৬৪ হাজার, তুরস্কে ৪ লাখ ৩৪ হাজার, রাশিয়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার, ইরানে ১ লাখ ৯৯ হাজার, যুক্তরাজ্যে ৮৬ হাজার, সৌদি আরবে ৪৮ হাজার, জাপানে ৪১ হাজার জন কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ডব্লিউপিবির হিসাব করা ২২৪ দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম বন্দী রয়েছেন টুভালু ও লিশটেনস্টাইনে, মাত্র ১১ জন করে।
‘অমানবিক পরিবেশ’
বাংলাদেশের কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকলেও চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। বন্দিদের খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, জামিন না দেওয়ার অভিযোগও বহু বছর ধরে রয়েছে।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দেশের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বন্দীতে ঠাসা। এতে বন্দিদের অনেকেই মানবেতর বা অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। নতুন কারাগার নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান কারাগারগুলোর সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
বিচারপূর্ব বন্দিদের বিষয়ে মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের অনেক আদালতে একজন বিচারকের ওপর কয়েক হাজার মামলা রয়েছে, যা বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপূর্ব বন্দিরা দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকছেন, ফলে কারাগারের ওপর চাপও বাড়ছে।
মইনুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচারকদের ‘লজিস্টিক’ সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারব্যবস্থায় বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে ই-জুডিশিয়ারি চালু করে বিচারিক কার্যক্রমের অটোমেশন (স্বয়ংক্রিয়করণ) করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেওয়ানি মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ফৌজদারি মামলায় ‘প্লি বার্গেনিংয়ের’ মতো ব্যবস্থা চালু করা গেলে আদালতে মামলার চাপ কমানো সম্ভব।
‘প্লি বার্গেনিং’ হলো আদালতের বিচার এড়াতে মামলার বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে একটি পারস্পরিক আইনি সমঝোতা। এতে আসামি নিজের অপরাধ স্বীকার করার বিনিময়ে ছাড় পান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন