০৯:৩২ এম
বঙ্গোপসাগরের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগকে সরকার আরও জোরদার করছে।
নতুন নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়নের মাধ্যমে সামুদ্রিক মৎস্য চাষ, কাঁকড়া উৎপাদন, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং সামুদ্রিক গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়েও মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সামুদ্রিক সম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও, গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরা এবং সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন: রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত, দক্ষিণ আমেরিকায় ৩ মাসে বিপুল আয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং তদারকি জোরদার করা গেলে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
এ লক্ষ্যে, সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সমুদ্রভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য একাধিক খসড়া নীতিমালা ও নির্দেশিকা তৈরি করেছে সরকার। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমুদ্রসম্পদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানান, উল্লেখযোগ্যভাবে শিথিল শর্তে সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় ভোলা ও ফেনী অঞ্চলে গ্যাসের মজুত পাওয়া যাওয়ায়, সরকার সমুদ্রেও গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
আরও পড়ুন: কৃষিঋণের খেলাপির হার ৪২%
২০২৬ সালের বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ডের আওতায় সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) প্রতিস্থাপন করা হবে। নতুন কাঠামোয় গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সংশোধন, পাইপলাইন নির্মাণে সহায়তা এবং অনুসন্ধান চালিয়ে বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নীল অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, সমুদ্রের গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান করে নতুন মজুত পাওয়া গেলে তা দেশের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে।
তিনি আরও বলেন, নীল অর্থনীতির উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
মৎস্য খাতে টেকসই উৎপাদনের উদ্যোগ
আরও পড়ুন: দেশের ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫.০৭ মেগাওয়াট
সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার সামুদ্রিক জলজ চাষ বা মেরিকালচার নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সামুদ্রিক জলজ চাষকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৬ সালের জুনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদী, হ্রদ ও জলাভূমি থেকে মাছ আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং চাষের মাধ্যমে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টন। এ উৎপাদন দেশের বার্ষিক প্রায় ৫০ লাখ টন চাহিদার চেয়েও বেশি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত নীতিমালায় সামুদ্রিক জলজ চাষ সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: সৌদি আরব থেকেই আসতে পারে জ্বালানি তেলের পরবর্তী বড় ধাক্কা
এ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত উপকূলীয় মৎস্য আহরণের বাইরে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, সামুদ্রিক জলজ প্রাণী উৎপাদন এবং সমুদ্রভিত্তিক অন্যান্য শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে, কাঁকড়ার উৎপাদন, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি আরও সুশৃঙ্খল করতে ‘টেকসই কাঁকড়া উৎপাদন, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি নির্দেশিকা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে সরকার। এর লক্ষ্য হলো কাঁকড়ার জীববৈচিত্র্য রক্ষা, উৎপাদনপদ্ধতির উন্নয়ন এবং রপ্তানি আয় বাড়ানো।
প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় বিনিয়োগ আকর্ষণ, আহরণ-পরবর্তী ক্ষতি কমানো, হিমাগার ও শীতল সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা, মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের কথা বলা হয়েছে। উন্নত চাষ ও আহরণপদ্ধতি অনুসরণ করা গেলে পণ্যের মান বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে, দেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) বাইরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী মাছ ধরার জাহাজ পরিচালনা নিয়ন্ত্রণে ‘গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ নির্দেশিকা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
আরও পড়ুন: আরএসজিটি বাংলাদেশের নতুন রেকর্ড: পতেঙ্গা টার্মিনালে ঘণ্টায় ৭২ মুভ ও ১২২ টিইইউ'স
এতে জাহাজের লাইসেন্স, মাছ ধরার কার্যক্রম, আহরণ করা মাছের হিসাব সংরক্ষণ, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে মাছ স্থানান্তর, মাছের উৎস শনাক্তকরণ, নজরদারি, নাবিকদের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, অবৈধ, অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ বন্ধ এবং দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নির্দেশিকা আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাংলাদেশের মৎস্য আহরণ সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য জাহাজ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, মাছের মজুত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, আহরণ সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও রপ্তানি লক্ষ্য
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কুয়াকাটা ও সালিমপুরে দুটি নতুন সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে দেশে ঘোষিত সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ও সামুদ্রিক রিজার্ভের সংখ্যা বেড়ে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: নগদ লেনদেনে ব্যয় ডিজিটালের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি
এসব এলাকা ঘোষণার উদ্দেশ্য হলো সামুদ্রিক আবাসস্থল রক্ষা এবং মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলার।
সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা মাছের মজুত পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে কার্যকর নজরদারি, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, টেকসই অর্থায়ন এবং উপকূলীয় জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নীল অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে নীল অর্থনীতি গবেষণার জন্য পৃথক তহবিলে রাখা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা।
জ্বালানি ও সমুদ্রভিত্তিক শিল্পে সম্ভাবনা
নীল অর্থনীতির আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র সমুদ্রের তলদেশে জ্বালানি অনুসন্ধান। সরকার সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন উৎপাদন-অংশীদারত্ব চুক্তি করেছে এবং পরিকল্পিত খনন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন, রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং পায়রা বন্দরের কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি সম্প্রতি জানিয়েছেন, সরকার স্থলভাগে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ৩০টি কূপ খননের উদ্যোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি কূপের কার্যক্রম চালু হয়েছে।
মৎস্য ও জ্বালানি খাতের বাইরে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সমুদ্রভিত্তিক সেবাশিল্পেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
এসব শিল্পের বিকাশে বন্দর ও উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে সংযোগ জোরদার, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
নীতিমালা থেকে বাস্তবায়নে গুরুত্ব
বিশাল সামুদ্রিক সম্পদকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হলে নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
সামুদ্রিক সম্পদের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
মেরিকালচার, কাঁকড়া উৎপাদন ও গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ নিয়ে খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে নীল অর্থনীতি বিকাশের একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি করছে সরকার।
এখন এসব উদ্যোগ বাস্তবে রূপ দিতে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করা গেলে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ রপ্তানি আয়, জ্বালানিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। সূত্র: বাসস
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন