০৪:২৮ পি.এম
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ম উপাচার্য হিসেবে ১৪ মে নিয়োগ পান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোশারফ হোসেন। সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণের পর আরটিভিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গবেষণা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, করপোরেট সংযোগ, সমাবর্তন ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি মতামত প্রদান করেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আরটিভির নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা আবু তাহের।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখনও পর্যন্ত একটি মাত্র সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রশাসনের দ্বিতীয় সমাবর্তন নিয়ে কী পরিকল্পনা আছে?
উপাচার্য: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছরের যাত্রায় এই সময়টিতে একবারই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় সমাবর্তনের জন্য আমাদের অনেক শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছেন। আসলে সমাবর্তন আয়োজন করা ব্যয়বহুল এবং এতে অনেকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দিকও এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা হয়নি। আমাদের লোকবলের অভাব রয়েছে এবং অর্থসংকট রয়েছে। তবে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য সমাবর্তন একটি আবেগের জায়গা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুনভাবে দেখতে চায়। আমরা তাদের এই চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ করছি। দ্বিতীয় সমাবর্তন আমরা খুব ধুমধাম ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করার চেষ্টা করছি। আমরা ধীরে ধীরে সমাবর্তন খাতে অর্থ জমা করানোর চেষ্টা করছি। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অতি দ্রুতই দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকটের পরীক্ষা চলছে। বর্তমানে আবাসন সংকট নিরসনে বর্তমান প্রশাসনের পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসনের ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে আছি। আমাদের চারটি হলে মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশের অধিক জায়গা রয়েছে। নতুন দুটি বৃহৎ হল নির্মাণের কাজ চলছে, যা বাংলাদেশে খুবই বিরল। আমরা আশা করছি, সেপ্টেম্বর মাসে এটিকে হস্তান্তর করা হবে এবং আমাদের সেখানে অ্যালটমেন্ট দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হলের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। আমরা ফার্নিচারের অর্ডারও দিয়েছি। যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে হল দুটি বুঝে নিতে পারি, তাহলে ৩ হাজার অতিরিক্ত শিক্ষার্থীকে আবাসনের সুযোগ দিতে পারব। ফলে আমরা ৫০ শতাংশ আবাসন সুবিধা পেতে সক্ষম হব। আমাদের আরও ৭৫ একর জমি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে তিনটি হলের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এটি আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। সেক্ষেত্রে আবাসন সংকট থাকবে না।
আরটিভি: পরিবহন সংকটের বিষয়টিও রয়েছে। শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিপরীতে আমাদের অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা কম। এই বিষয়ে প্রশাসনের পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: আমাদের মূলত একটি অফিসিয়াল অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, তবে আমরা আরেকটি গাড়ি অ্যাম্বুলেন্সের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছি। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অসুস্থকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য মূল অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই পরিবহন খাতে নতুন গাড়ির বাজেট পাচ্ছি না। ২৪টি গাড়ি ধরনের অবস্থা আছে আমাদের পরিবহন খাতে, যেগুলো বেশিরভাগই বিআরটিসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ভাড়া দিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং তাদের কাছে সহযোগিতার জন্য আবেদন করেছি, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
আরটিভি: বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? বিশ্ববিদ্যালয়কে আগামী দিনে কোথায় দেখতে চান?
উপাচার্য: আমার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করানো নয়, বরং তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। তাই আমরা দেশের ও বিশ্বের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষতা অর্জন করেছে, তাদের মতো ভালো কাজগুলো অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। আমরা বিভিন্ন দেশের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর ব্যবস্থা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী করে লাগু করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সাম্য, মানবতা, প্রেম, নেতৃত্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা নজরুল আমাদের দিয়েছেন, সেগুলো আমাদের ধারণ করতে হবে। তাহলে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। আমরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে কর্মরত। শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেবো। লক্ষ্য হলো, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি জায়গায় দাঁড় করানো, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষা পাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার আকার খুবই ক্ষীণ। গবেষণা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রশাসনের কি পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী ও ক্লাসমুখী করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউজিসি এমএসসি, এমফিল এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি চালুর পরিকল্পনা করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আওতায় এ ধরনের প্রণোদনা দিয়েছি। বৃত্তির আওতায় শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে আমরা ঘোষণা করেছি, প্রত্যেকটি ফ্যাকাল্টিতে সেরা একজন শিক্ষার্থীকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করছি।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। আপনি নিয়োগে কীভাবে স্বচ্ছতা রাখতে চান?
উপাচার্য: নিয়োগ নিয়ে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি বা অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। আমি এই ধারাটিকে রোধ করতে একটি স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো। নিয়োগের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছি। নিয়োগের প্রক্রিয়ায় মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো, যে পদের জন্য যিনি বেশি যোগ্য, তাকেই সেই পদে নিয়োগ দেওয়া।
আরটিভি: ক্যাম্পাসের সবুজায়ন তুলনামূলকভাবে কম। ক্যাম্পাসকে সবুজায়নে প্রশাসনের পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই সুন্দর, পরিকল্পিত ও সবুজ ক্যাম্পাস গড়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। ভবিষ্যতে ভবন, রাস্তা, মাঠ বা অন্যান্য স্থাপনাগুলো পরিকল্পনামতো স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় গাছ লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, আঞ্চলিক সংগঠন ও অন্যান্য সংগঠন এই কাজে সহযোগিতা করছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায়ই ক্যাম্পাসে গাছ লাগানোর কাজ চলছে।
আরও পড়ুন: "অসহিষ্ণু বক্তব্য রাজনীতিকে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে পারে": সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
আরটিভি: সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আনার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে থাকা ভিত্তিপ্রস্তরটি আমাদের ক্যাম্পাসের ভেতরে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। সেখানে একটি স্মৃতি সংগ্রহশালা তৈরি করাও আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে। একইভাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বটতলাটিকেও ক্যাম্পাসের সীমানায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে, যেখানে একটি নজরুল সংগ্রহশালা করা হবে। ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখিয়েই এসব স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি।
আরটিভি: সরকারি ও বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অংশীদারিত্ব জোরদার করার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: আমরা এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছি। ইতোমধ্যে `Industry Academia Collaboration` শীর্ষক একটি সেমিনার করেছি। শিক্ষার্থীরা স্নাতক হওয়ার পর যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলো চিহ্নিত করার কাজ হচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সিলেবাস প্রণয়নে অ্যালামনাইদের যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের থিসিস, প্রজেক্ট ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা করছে। ইউজিসি ইতোমধ্যে ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে, যা ভবিষ্যতে ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীতকরার পরিকল্পনা রয়েছে। এই তহবিল একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: আনোয়ারায় কেইপিজেড ও চায়না ইকোনমিক জোন পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী
আরটিভি: আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তৈরি করার জন্য আপনার উদ্যোগ কী?
উপাচার্য: আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের জন্য যেসব নিয়ামক রয়েছে, সেগুলো অর্জন ও প্রবর্তনের জন্য আমরা কাজ করছি। আমাদের অনেক শিক্ষকের ভালো ভালো পাবলিকেশন বের হয়েছে। সম্প্রতি কিউ-ওয়ান (Q1) জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেলগুলোর জন্য আমরা প্রত্যেকটি ফ্যাকাল্টির সেরা একজন শিক্ষককে পুরস্কৃত করেছি। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও কিউ-ওয়ান জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশিত হলে এ ধরনের প্রণোদনা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে গবেষণা কার্যক্রম আরও দ্রুত হয়। র্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সাইটেশনও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা এবং মানসম্মত পাবলিকেশনের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। শিক্ষকদের তাদের গবেষণা ও অর্জনগুলো ব্যক্তিগত প্রোফাইলে তুলে ধরতে উৎসাহিত করছি। ইতোমধ্যে আমাদের একটি আর্টিকেল এক মাসের মধ্যে ৯০০টি সাইটেশন পেয়েছে এবং কয়েকজন শিক্ষকের সাইটেশন ৫ হাজারের উপরে। এটা একটি তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আশা করি, আমাদের গবেষকদের অবদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন