সোমবার, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৫:৫৯ পি.এম
অচেনা জান্নাত ইমান্তা বিকেএসিপতে সুযোগ পাওয়ার জন্য ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করেছেন। এখন তিনি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে পাকিস্তানে খেলার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মেম্বার আনিসুর রহমান ও আটগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আকলিমা খাতুনের মেয়ে জান্নাত ইমান্তা বোচাগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নের বুড়াশাহা গ্রামের বাসিন্দা।
জান্নাতের মায়েরও খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল। তবে সমর্থন না পাওয়ার কারণে আকলিমা খাতুন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু তিনি মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। নিজের শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে আকলিমা বলেন, ‘আমি এক সময় ভালো খেলতাম। কিন্তু সাপোর্ট পাইনি। তাই সামনে এগোতে পারিনি। আমার মেয়ের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে যখন সেতাবগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করাতে যাই, তখন সেখানে কোনো মেয়ে খেলোয়াড় ছিল না। তাই তারা ভর্তি নিতে চায়নি। আমি তাদেরকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করাই। পরে তারা ভর্তি করে নেয়। আমার মেয়েকে একাই ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করতে হয়েছে। সেতাবগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমির কোচ ও ছেলে শিক্ষার্থীরা তাকে সবাই সহযোগিতা করেন।’
সেতাবগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমিতে নিজেকে শাণিত করে ২০২১ সালে বিকেএসপিতে সুযোগ পান জান্নাত। এবার তিনি দেশের প্রতিনিধি হয়ে পাকিস্তানে যাচ্ছেন। দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চেয়ে আকলিমা বলেন, ‘পরে ২০২১ সালে অচেনা জান্নাত ইমান্তা বিকেএসপিতে চান্স পায়। সেখান থেকে সে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। সেখান থেকেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পায়। আজ সে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে পাকিস্তান সফরে যাচ্ছে। আমি তার জন্য বোচাগঞ্জসহ দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’
জান্নাতের গুরু নূর আলম রনি জানাচ্ছেন, অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পাওয়ায় তিনি গর্ববোধ করছেন। সেতাবগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমির কোচ রনি বলেন, ‘আমার একাডেমিতে কোনো মেয়ে খেলোয়াড় ছিল না। এখনো নেই। প্রথমে তাকে ভর্তি করে নিতে চাইনি। পরে তার মায়ের পিড়াপিড়িতে ভর্তি করে নিই। সবার সহযোগিতায় তার নিজের প্রচেষ্টায় এত ছেলের মাঝে মাত্র একজন মেয়ে দুই বছর কোচিং করে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। আজ সে সাফল্য পেয়েছে, বাংলাদেশের হয়ে খেলবে। এ জন্য আমি আনন্দিত ও গর্বিত। আমি তার সফলতা কামনা করছি।’
বোচাগঞ্জের তরুণ-তরুণীদের অনুপ্রেরণা হিসেবে মারুফ হাসান জানাচ্ছেন, জান্নাতের এই অর্জনে তারা গর্বিত। বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি বলেন, ‘অচেনা জান্নাত ইমান্তার এই অর্জনে আমরা গর্বিত। প্রতিকূলতা পেরিয়ে সে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বোচাগঞ্জের অন্য তরুণ-তরুণীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। তার সাফল্য কামনা করছি এবং ভবিষ্যতেও তার পাশে থাকার চেষ্টা করব।’
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ছাড়াও ত্রিদেশীয় সিরিজের অন্য দল হচ্ছে শ্রীলংকা। আজ রাতে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে পাকিস্তান সফরে যাবে বাংলাদেশ দল।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ভাদ্র মাসের তীব্র খরতাপ এবং ভ্যাপসা গরমে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বাসিন্দারা হাঁসফাঁস অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। গত কয়েকদিনের টানা তাপদাহে মাঠ, ঘাট এবং পথপ্রান্তর তপ্ত হয়ে উঠেছে। একটু স্বস্তির বাতাসের খোঁজে মানুষ গাছের ছায়ায় ছুটছেন। দুপুরের তীব্র রোদে রাস্তাঘাট এবং হাটবাজার ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। গরমের এই প্রভাব একদিকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিয়েছে, অন্যদিকে গরমজনিত ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গ্রাম থেকে বাজার— সর্বত্র গরমের একই প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যারা কাজের তাগিদে বাইরে বের হচ্ছেন, তারা রোদের তীব্রতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের এবং শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
রোদের তীব্রতায় অতিষ্ঠ হয়ে উপজেলার স্থানীয় এক পথচারী মন্তব্য করেন, ‘যে রোদ আর গরম পড়েছে, বাইরে টিকে থাকা অসম্ভব। দুপুর হলেই রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ে। একটু বাতাসের আশায় গাছের ছায়ায় বসেও শান্তি মিলছে না।’
এদিকে, আবহাওয়ার এই বৈরী পরিবর্তনের ফলে ব্রাহ্মণপাড়ার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে জ্বর, সর্দি, কাশি এবং ডায়রিয়া। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও প্রবীণদের সংখ্যা বেশি। উপজেলার সরকারি এবং বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে দিন দিন এসব রোগীর ভিড় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে এ পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মনিরুল ইসলাম জানান, ‘আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে সব বয়সের মানুষই কম-বেশি জ্বর, সর্দি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকের ভাইরাসজনিত তীব্র জ্বর হচ্ছে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’
তিনি আরও বলেন, এই সময়ে শিশু ও বয়স্কদের যতটা সম্ভব ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা উচিত। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া তীব্র গরমে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ এড়াতে ফোটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান করার এবং যেকোনো অসুস্থতায় দ্রুত নিবন্ধিত (রেজিস্টার্ড) চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অনুরোধ জানান এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের সময় দুবার বিমান হামলার সম্মুখীন হয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে এই বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরেছেন ইরানের বিশেষজ্ঞ সভার সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহসেন হেইদারি আলে কাসির।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবনে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এই হামলায় তার বাবা নিহত হন এবং মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হয়ে তেহরানের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন।
পরবর্তীতে মার্কিন বাহিনী ওই চিকিৎসাকেন্দ্রটিতেও বোমা হামলা চালালে তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরেন। হামলার পরপরই তাকে এক অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এরপর থেকে তিনি আর প্রকাশ্যে আসেননি।
এদিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিজের নাম ঘোষণার আগে মোজতবা নিজেও এ বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে জানিয়েছেন ওই ধর্মীয় বক্তা। ৫৯টি ভোটের মধ্যে ৫০টি ভোট পেয়ে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন বলে ধারণা করা হলেও, সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
সূত্র: এনডিটিভি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ চলমান মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত সংঘাত এবং সেখানে বৈশ্বিক গণমাধ্যমের ভূমিকা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করেছে। এই বিশেষ আন্তর্জাতিক সেমিনারটি মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে।
‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও বিশ্ব গণমাধ্যম: নৈতিক জবাবদিহি ও আত্মসমালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক গ্রেগরি জে. সিমনস।
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূত আলেক জান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিন এবং ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী।
অনুষ্ঠানে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইস উদ্দীন এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। একাডেমিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক এবং আইন বিভাগের শিক্ষক আহমদ ইহসানুল কবীর।
জবির ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শাহ মো. নিসতার জাহান কবীর সংবাদ মাধ্যমকে আয়োজনে সারসংক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, "আমি আসলে এই প্রোগ্রামটা নিয়ে খুবই আশাবাদী এবং আনন্দিত। পৃথিবীতে চলমান সবচেয়ে ক্রুশিয়াল একটি বিষয় নিয়ে আমরা এই প্রোগ্রামটি করছি। মিডল ইস্টের যুদ্ধ এবং সেখানে বৈশ্বিক মিডিয়ার দায়-দায়িত্ব, তাদের নীতি-নৈতিকতা এবং তাদের যে কার্যকলাপ সেটির ওপরে এই প্রোগ্রামটি অনুষ্ঠিত হবে।"
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এই অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "এই প্রোগ্রামটিতে উপাচার্য থেকে শুরু করে শিক্ষক, ছাত্র সবার মধ্যে একটা অন্যরকম উৎসব উৎসব আমেজ তৈরি হয়েছে, যা আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করেছে। আমি মনে করি এটি এমন একটি একাডেমিক প্রোগ্রাম যা অনেকেই অনুসরণ করবেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বাইরের আগ্রহী গবেষক ও শিক্ষার্থীদেরও বিশেষ আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আশা করি সবার সার্বিক সহযোগিতায় উৎসবমুখর পরিবেশে এই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হবে।"
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং শিল্পাঞ্চল একটি দেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে পরিচিত। তবে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের চূড়ান্ত সিঁড়িটি তৈরি হয় মানুষের মেধা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে সস্তা ও বিপুল শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরতার পুরোনো মডেল থেকে বেরিয়ে উৎপাদনশীল, দক্ষতা ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে যাওয়ার তাগিদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিষয়টি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিনিয়োগকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, "উৎপাদন ও বিনিয়োগকে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।" অর্থাৎ বিনিয়োগ যেন শুধু সম্পদ তৈরি না করে, উৎপাদন বাড়ায়; উৎপাদন যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং সেই কর্মসংস্থান যেন আয় ও রাজস্ব বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করে। তিনি আরও বলেন, পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
তিতুমীর আরও জানান, সরকার ঋণনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়। এজন্য শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন দক্ষ শ্রমশক্তি, মানসম্মত কর্মসংস্থান ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, "শ্রমজীবী মানুষ জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।" তিনি তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, কর্মসংস্থানের মান এবং শ্রমিকের দক্ষতাকেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম তাঁর বিশ্লেষণে শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের মূল প্রশ্নটি সামনে এনেছেন, "উন্নত অর্থনীতির পথে আসল বিনিয়োগ কোথায়?"
সাকিফ শামীমের মতে, উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে শুধু অবকাঠামো, মূলধন কিংবা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে উন্নত হয়নি। একটি পর্যায়ে গিয়ে প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা ও উদ্ভাবন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশটি প্রথমে শ্রমনির্ভর শিল্প ও রপ্তানির ওপর দাঁড়ালেও পরে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায়। সেই দক্ষ শ্রমশক্তিই পরে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে তোলে।
তাইওয়ানের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। কৃষি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি ইলেকট্রনিকস, নির্ভুল উৎপাদন ও সেমিকন্ডাক্টর ভিত্তিক শিল্পে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি সরাসরি যে, শুধু কত মানুষকে শিক্ষিত করা হলো, তা নয়; সেই মানুষ কতটা দক্ষ হলো এবং অর্থনীতিতে তার দক্ষতা কতটা কাজে লাগানো হলো। দেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছেন। অথচ শিল্প ও ব্যবসা খাতে নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মীর ঘাটতির কথা শোনা যায়। অর্থাৎ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে এখনও বড় ফাঁক রয়েছে। এই ফাঁক দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতকে একই দক্ষতা-ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। কারিকুলাম নির্ধারণে শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি কর্মজীবীদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করছে। হিসাব, সফটওয়্যার, ডিজাইন, কনটেন্ট, গ্রাহকসেবা, গবেষণা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই কাজের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের তরুণদের প্রচলিত দক্ষতা নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
শামীম বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বদলাবে। কম শ্রমমূল্যের সুবিধার পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান ও দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে এখন থেকেই শিক্ষা, দক্ষতা, শিল্পনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নীতিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় প্রকল্প হতে পারে মানুষের সক্ষমতা তৈরি। শিক্ষা, দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সেই বিনিয়োগ যত কার্যকর হবে, তত দ্রুত শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, উৎপাদনশীল ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে পারবে বাংলাদেশ।
সিএসইআর এর বিশ্লেষণ : সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম সম্প্রতি সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়-উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কোনো দেশ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, মূলধন বিনিয়োগ কিংবা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়নি। একটি পর্যায়ে গিয়ে প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা এবং উদ্ভাবন। বাংলাদেশও এখন ঠিক এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েক দশকে অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির কাঠামো বদলেছে। কিন্তু আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির জন্য আগের মডেলটি যথেষ্ট কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট বলছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বর্তমানে নানা চাপের মুখে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি। অর্থাৎ সামনে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়, সেই প্রবৃদ্ধিকে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী করা। এখানেই শিক্ষা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের বিষয়টি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় চলে আসে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি বড় ভিত্তি ছিল শ্রমনির্ভর শিল্প। তৈরি পোশাক খাত তার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। বিপুল শ্রমশক্তিকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনীতির পরবর্তী ধাপে শুধু শ্রমের পরিমাণ দিয়ে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে। আঙ্কটাড (UNCTAD)-এর বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিযোগিতার ভিত্তি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা থেকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা নির্ভর ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। এ পরিবর্তনের অর্থ, একই সংখ্যক মানুষকে দিয়ে আরও বেশি মূল্য তৈরি করতে হবে। একজন কর্মী যদি শুধু নির্দিষ্ট একটি কাজ করতে পারেন, তাহলে তার উৎপাদনশীলতার একটি সীমা থাকে। কিন্তু সেই কর্মী যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন, সমস্যার সমাধান করতে পারেন, নতুন পদ্ধতি শিখতে পারেন এবং কাজের মান উন্নত করতে পারেন, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেড়ে যায়। কতজন মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তারা কতটা দক্ষ হয়ে উঠছে এবং সেই দক্ষতা অর্থনীতিতে কতটা কাজে লাগছে। দক্ষ জনশক্তিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তিতে পরিণত করার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র একটি দেশ থেকে কয়েক দশকের মধ্যে কোরিয়া কীভাবে উচ্চ আয়ের, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর ধারাবাহিক বিনিয়োগ। শুরুতে দেশটি বিপুল শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে শ্রমনির্ভর শিল্প ও রপ্তানি বাড়িয়েছে; এরপর শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে সেই শ্রমশক্তিকেই উচ্চদক্ষ কর্মীতে রূপান্তর করেছে। ফলে কোরিয়ার শিল্পও ধাপে ধাপে টেক্সটাইল ও সাধারণ উৎপাদন থেকে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতে উঠে গেছে। বিশ্বব্যাংক কোরিয়ার এই রূপান্তরের পেছনে শিক্ষিত শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি গ্রহণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোরিয়ার প্রকৃত জিডিপি (GDP) গড়ে বছরে ৫.৬ শতাংশ হারে বেড়েছে এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় ১৯৫০-এর দশকের প্রায় ৬৭ ডলার থেকে ২০২৪ সালে ৩৬,৬২৪ ডলারে পৌঁছেছে। তাইওয়ানের অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশটি একসময় মূলত কৃষি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে electronics, precision manufacturing এবং semiconductor-ভিত্তিক শিল্পে চলে যায়। এর ফলে কর্মসংস্থানের ধরনই বদলায়নি, বদলে গেছে পুরো অর্থনীতির উৎপাদন কাঠামো ও রপ্তানির চরিত্র। বিশেষ করে উচ্চদক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির সঙ্গে গবেষণা অবকাঠামো এবং শিল্পের সংযোগ তৈরি করাই তাইওয়ানের প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্প গড়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশে এখন অবধি উচ্চশিক্ষার বিস্তার এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মধ্যে সবসময় সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বের হচ্ছেন। একই সময়ে শিল্প ও ব্যবসা খাত বলছে, নির্দিষ্ট দক্ষতার মানুষের ঘাটতি রয়েছে। এই ব্যবধানটি দেখায়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় অর্ধেকই কম বেতনের কাজে নিয়োজিত এবং এটি দক্ষতার অসামঞ্জস্যের একটি ইঙ্গিত। একই প্রতিবেদনে নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জও তুলে ধরা হয়েছে। একজন তরুণের চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ করার পর যদি তাকে আবার কর্মক্ষেত্রের মৌলিক দক্ষতার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয়, তাহলে শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে কোথাও একটি বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। এই জায়গাটি ঠিক করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতকে আলাদা আলাদা কাঠামো হিসেবে না দেখে একই দক্ষতা-ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তন এই আলোচনাকে আরও জরুরি করে তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ইতোমধ্যে বিভিন্ন পেশার কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। হিসাব, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, সফটওয়্যার, ডিজাইন, গ্রাহকসেবা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রায় প্রতিটি খাতেই AI নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, AI মানুষের বিকল্প হবে কি না তা না ভেবে মানুষ AI কে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে সেটি। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও AI দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও চাকরির সঙ্গে দক্ষ মানুষের কার্যকর সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি বড় সুযোগও হতে পারে। কারণ দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী যদি সঠিক প্রশিক্ষণ পায়, তাহলে শুধু দেশের শ্রমবাজার নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতেও অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। উন্নত অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা কেবল বিদ্যমান প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে কাজ করে। বাংলাদেশে গবেষণা এখনও অনেক ক্ষেত্রে একাডেমিক প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। গবেষণার ফলাফল শিল্পে কতটা ব্যবহার হচ্ছে, কতগুলো নতুন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, কতগুলো গবেষণা থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোগ তৈরি হচ্ছে, এসব প্রশ্নও সামনে আনা দরকার। দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সেই দক্ষতা ব্যবহারের মতো কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করা তরুণদের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। একই সময়ে অধিক উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে অনেক কর্মসংস্থান কম উৎপাদনশীল খাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য একট অশনি সংকেত। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে, নতুন শিল্প ও সেবা খাত তৈরি করতে হবে এবং এমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে যেখানে দক্ষতার যথাযথ মূল্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ শিক্ষা নীতি, দক্ষতা নীতি, শিল্পনীতি ও কর্মসংস্থান নীতিকে পরস্পর থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ দেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বদলাবে। UNCTAD এর বিশ্লেষণেও এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এখন থেকেই উৎপাদনের মান বাড়ানো, প্রযুক্তি গ্রহণ, পণ্যের বৈচিত্র্য, গবেষণা এবং দক্ষ জনশক্তির দিকে আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল জিডিপি বাড়ালেই উন্নয়ন হবে না। মানুষের আয়, কাজের মান, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনযাত্রার সুযোগও বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শিল্পাঞ্চলের মতো দৃশ্যমান অবকাঠামো সামনে আসে। এগুলোর তাৎপর্য অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু একটি আধুনিক অর্থনীতির জন্য মানুষের দক্ষতাও এক ধরনের অবকাঠামো। একটি রাস্তা পণ্য পরিবহন সহজ করে। একজন দক্ষ মানুষ সেই পণ্যকে আরও ভালোভাবে উৎপাদন, বাজারজাত কিংবা রপ্তানি করতে পারে।
শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষার আধুনিকীকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, শিল্পের সঙ্গে সংযোগ এবং কর্মজীবীদের পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ সবকিছুকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাওয়ার পথটি আরও মসৃণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে দ্বিতীয় সারির শিক্ষা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। একই সঙ্গে যারা ইতোমধ্যে কর্মক্ষেত্রে আছেন, তাদের জন্যও নতুন প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, আমরা কি আরও বেশি মানুষকে কর্মবাজারে প্রবেশ করাব, নাকি আরও বেশি উৎপাদনশীল মানুষ তৈরি করব?
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে যে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে, তার পরবর্তী ধাপ হবে সেই ভিত্তির ওপর জ্ঞান ও দক্ষতানির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা। এখন প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা, যা উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ কর্মী এবং নতুন ধারণা তৈরি করতে সক্ষম মানুষ তৈরি করবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ তাই হয়তো কোনো একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। সেটি হবে মানুষের ওপর শিক্ষায়, দক্ষতায়, গবেষণায় এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগে। সেই বিনিয়োগ যত বেশি কার্যকর হবে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিও তত বেশি টেকসই, উৎপাদনশীল ও উচ্চমূল্যের অর্থনীতির দিকে এগোতে পারবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ