১২:৪৯ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাত এখন আর কেবল সাময়িক সংকট হিসেবেই দেখা যাচ্ছে না। বরং এটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হতে শুরু করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরেশিয়া অঞ্চলে উদ্ভূত এই নতুন অস্থিরতা আগামী বহু বছর ধরে গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে চলেছে।
ইরানের এই সংকট কেবল তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং ইরান ব্রিকস এবং সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাশিয়ার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত যেমন ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়, তেমনটি ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে একটি বিভক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্রিকস ও এসসিওর মতো সংস্থাগুলো কতটুকু এবং কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
উভয় জোটের জন্ম হয়েছিল দুই হাজারের দশকের শুরুতে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংকটের ফলস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং ইরাক আক্রমণ যখন বিশ্ববাসীকে বুঝতে সক্ষম করে দেয় যে একমেরুর বিশ্বব্যবস্থা স্থিতিশীলতা বা নিরপেক্ষ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ, তখনই ইউরেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য ২০০১ সালে এসসিও এবং ২০০৯ সালে ব্রিকস আত্মপ্রকাশ করে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩ অভিবাসীর মৃত্যু, পাচারকারীর ৩০ বছরের কারাদণ্ড
যাহোক, কোন জোটই সরাসরি পশ্চিমাবিরোধী বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করে না। এ সংযম দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, পশ্চিমাদের প্রতি ভিন্ন মত পোষণকারী দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে রাখা। দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল মেজরিটির যেসব দেশ একই সাথে চীন-রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চাইছে, তাদের দূরে না ঠেলাও ছিল। ফলে ব্রিকস ও এসসিও সাধারণ ঐক্যমতের নীতিতে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখে এসেছে।
তবে এই মধ্যপন্থার কৌশল এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। যদি পশ্চিমারা কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারতো, তবে এমন জোট গঠনের প্রয়োজনই হতো না। তাই বিলম্বিত হলেও সংস্থা দুটিকে উত্তর-পশ্চিম ব্যবস্থার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা ইরান সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এই সংঘাত জোটের ভেতরের মতপার্থক্যও সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কেবল রাশিয়াই স্পষ্ট নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে চীন, ভারতসহ অন্যান্য সদস্যরা অনেক বেশী সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যা সমন্বিত কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
একই সময়ে সংঘাতটি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রথমত, পার্সি উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা এখন চরম হুমকির সম্মুখীন। রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিজস্ব সম্পদ সমৃদ্ধ কোনো দেশের জন্য এটি সামাল দেওয়া সহজ হলেও চীন ও ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।
আরও পড়ুন: ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি কঠিন, চাপ অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র: মার্কো রুবিও
দ্বিতীয়ত, পরিবহন এবং লজিস্টিকস খাতে নতুন সংকট হানা দিয়েছে। রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাথে যুক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত পর্যায়ক্রমে এই অঞ্চলে বিনিয়োগ এবং পরিকল্পনার জটিলতা তৈরি করবে। এর সাথে যদি ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে, তবে মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক কৌশলগুলোও পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে আঞ্চলিক মিত্র ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে চাপ বাড়ছে। মার্কিন বৈরিতার ফলে অঞ্চলটির ধনী উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিজেদের ইসরায়েলের মতো সম্পূর্ণ সামরিকীকৃত সমাজে পরিণত করতে চাইছে না। ফলে তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
তবে এই সংঘাত ব্রিকস ও এসসিওর জন্য একটি সুযোগও তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব এখন আর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বা উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। বরং অনেকেই তাদের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটনের উপর ইরানকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত তাদের কূটনৈতিক মনোযোগকে ক্ষয় করবে এবং একাধিক সংকট একসাথে সামলানোর সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর সুবিধা নেয়ার জন্য ব্রিকসকে কোনো কঠোর উগ্র জোট হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও নমনীয়তার সাথে কাজ করাই এই সংস্থাগুলোর আসল শক্তি। পশ্চিমা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যেভাবে কমছে, তাতে ব্রিকস ও এসসিও কৃত্রিম ঐক্য তৈরির চেষ্টা না করে নিজেদের নমনীয় ও সমন্বয়বাদী কাঠামো বজায় রাখলেই তাদের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রভাব ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
আরও পড়ুন: আজ বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গাপূজা
আরটির বিশ্লেষণ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন